আজ আমার সারাদিন ছুটি। কোনো রোগী দেখা নেই, বাজার করা নেই, শুধু ঘুম আর ঘুম।ছুটির দিনে এমনিতেই দেরী করে ঘুম থেকে উঠি, আজ আরো দেরীতে। সহধর্মিনী অবশ্য সকাল থেকেই বকর বকর করে যাচ্ছে, আমি খুব একটা পাত্তা দিচ্ছিনা। ছুটির দিনে আমার আরো একটা অভ্যাস আছে, সেটা হলো মুভি দেখা। আমি সাধারনত হলিউডের মুভি দেখি।বিছানাতে শুয়ে শুয়ে চিন্তা করছিলাম কি মুভি দেখা যায়। এমন সময় লিসা (যে সারাক্ষন ধরে বকর বকর করে যাচ্ছে)সকালের পত্রিকা হাতে নিয়েই চিৎকার করে উঠল।
গতকাল রাতে আমরা কেউ-ই ব্যস্ততার জন্য টিভিতে খবর শুনতে পারিনি, সে জন্য ওসামা বিন লাদেনের হত্যাকান্ডের খবর জানতেই পারিনি। কালের কন্ঠে ওসামার সৌ্ম্য, সুন্দর চেহারা দেখে মায়াই লাগছিলো। পরক্ষনেই মনে হলো এই মানুষটার জন্য অনেক নিরীহ মানুষ মারা গেছেন, ইসলামকে বলা হচ্ছিল সন্ত্রাসের ধর্ম। এই আল-কায়েদাকে কেন্দ্র করে আমেরিকা অনেক রাষ্ট্রকেই আক্রমনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছিলো।যা হোক অবশেষে লাদেন মারা পড়লো! কিন্তু এ কি?লাশ কেনো সাগরে সমাহিত করা হলো? জানি না, যেমন জানি না পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমীর নাকের ডগায় সে কিভাবে এতদিন ছিলো আর সেটা কেনো পাকিস্তান সরকার জানে না? আদার ব্যাপারীর জাহাজের খবর নিয়ে লাভ কি?
ছুটির দিনটাতে এইসব ঝুট ঝামেলা এড়িয়ে চলতে চাই। অতএব, ওসামা বিন লা্দেন বাদ। আজ Young Victoria দেখবো ঠিক করেছি, এই মহিলাকে না কি বলা হতো Grandmother of Europe। তাঁর নাতী-নাতনীদের মধ্যে ব্রিটিশ রাজ, জার্মান কাইজার, গ্রীস, রুমানিয়া, নরওয়ে, স্পেন-এর রানী থেকে শুরু করে রাশিয়ার শেষ জারিনা আলে্কসজান্দ্রা পর্যন্ত ছিলো। আলে্কসজান্দ্রার কথায় মনে পড়লো রুশ বিপ্লবের সময় তাকে তাঁর পরিবারের সকল সদস্যসহ লেনিনের আদেশে হত্যা করা হয়, ঠিক যেন বঙ্গবন্ধুর মতো।
কথায় আছে না, সুখে থাকতে ভুতে কিলায়। আমার হয়েছে সে দশা।দুপুরে খেয়ে কৈ একটু সুখনিদ্রা দিবো, তা না- আমাকে ভুতে কিলালো আমার সহকর্মী হাসপাতালে কি দূরবস্থার মধ্যে আছে তা দেখার জন্য হাসপাতালে যাওয়া। হাসপাতালে এসেই দেখি আড়াই বছরের এক ছোট্ট বাচ্চা নিয়ে জীবন-মরন খেলায় মগ্ন আমার সহকর্মী, যাকে আমি ইউসুফ ভাইয়া বলে ডাকি। উনার কাছ হতেই শুনলাম সকালে বাচ্চাটি বাবা-মার সাথে রিকশায় যাচ্ছিলো, পিছন হতে একটি বাস ঢাক্কা দেয়, বাবা-মার কারোই কিছু হয়নি, শুধু বাচ্চাটি ছাড়া। অতিদ্রুত সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়, কিন্তু সেখানে মাথায় আঘাতের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাচ্চাটিকে আমাদের এখানে পাঠিয়ে দেয়।
ইউসুফ ভাইয়া খেলায় হেরে গেলো। খুব শান্তভাবে বাচ্চার বাবা-মাকে বললো-আপনাদের ছেলেকে আমরা অনেক চেষ্টা করেও বাঁচাতে পারলাম না। আমি ইউসুফ ভাইয়ের কাজে একটু সাহায্য করলাম-মৃত্যুর সনদপত্র লিখে দিয়ে। নিজেরা কথা বলছিলাম এই সপ্তাহের mortality meeting-আরেকটা রোগী বাড়লো।
হাসপাতাল থেকে যখন বের হচ্ছিলাম তখন দেখলাম বাচ্চার মা কাঁদছে আর বলছে “ আল্লাহ আমাকে না নিয়ে আমার বাচ্চাকে নিলে কেনো?” আমি মাথা নত করে ধীর পায়ে বাসার দিকে আসতে লাগলাম।
কেওয়াইএএমসিএইচ,
০৩/০৫/২০১১
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন