সুতোমু ইয়ামাগুচি, ২৯ বছরের প্রাণোচ্ছ্বল একজন ইঞ্জিনিয়ার। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে ভালো রেজাল্টের জন্য খুব বেশীদিন বেকার থাকতে হয়নি, তাও আবার মিতসুবিশি হেভী ইন্ডাস্ট্রিসের মতো বড়ো একটা কোম্পানীতে চাকরি পাওয়া বিশাল ব্যাপার। সে আরো বেশী খুশি হলো যখন তার পোস্টিং হলো নিজের শহর নাগাসাকিতে। পরিবারের সাথে থাকতে পারবে –এই চিন্তাতেই তার সারারাত ঘুম হয় নি। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা ভাবেন আরেক!
নতুন অফিসের বস প্রথম দিন থেকেই কেনো যেনো সুতোমুকে পছন্দ করতে পারলেন না, অথচ অফিসের সবার কাছে জনপ্রিয় নাম সুতোমু। শেষে কিছুদিন পর বস তাকে ডেকে বললেন, ‘আমরা হিরোশিমা অফিসে একটি প্রজেক্ট খুলেছি। সেখানকার কাজ দেখার জন্য তোমাকে তিন মাসের জন্য যেতে হবে। তোমার সাথে যাবে আকিরা ইয়ানাকা এবং কুনিয়োশি সাতো।’ সুতোমু ইয়ামাগুচি তার বাচ্চা আর স্ত্রীর কাছ হতে বিষন্ন হৃদয়ে বিদায় নিয়ে দুই সহকর্মীর সাথে ১৯৪৫ সালের মে মাসের কোনো এক সকালে হিরোশিমার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলো।
৬ই আগষ্ট, ১৯৪৫ সাল। যুদ্ধের পশ্চিম ফ্রন্টে জার্মানী ইতিমধ্যেই আত্নসমর্পন করেছে, ইতালী তো অনেক আগেই সেই ১৯৪৩ সালেই মিত্র পক্ষে যোগ দিয়েছে। জাপানের অবস্থাও খুব সুবিধের নয়, মিত্র বাহিনী আত্নসমর্পনের সময় বেধে দিয়েছে। আর সবার মতো সুতোমুও জানে জাপান আর বেশী দিন টিকতে পারবে না। খুব তাড়াতাড়িই এই অভিশপ্ত যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। এমনিতেই গত কিছুদিন যাবত জাপানের প্রায় সব বড় শহরগুলোতে মিত্র বাহিনী অনবরত বোমা ফেলে যাচ্ছে, ইশ্বরের ইচ্ছায় হিরোশিমা আর তার নিজের শহর নাগাসাকিতে কোনো বোমা বর্ষন হচ্ছে না-এটা ভেবে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো সুতোমু। তার মনটা আজ খুব উড়ুউড়ু। আজ সকালে সে তিন মাসের কাজ শেষ করে নাগাসাকিতে ফিরে যাবে তার শিশু পুত্র আর সুন্দরী স্ত্রীর কাছে।
সকালে ডকইয়ার্ডে আসার পর সুতোমুর খেয়াল হলো সে তার অফিসিয়াল সিল অফিসের ড্রয়ারে রেখে এসেছে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সাতটা বাজে। ইয়ানাকা আর সাতোকে অপেক্ষা করতে বলে সে অফিসে গেলো। সিল নিয়ে বের হবার সময় করিডোরে এক পুরানো ক্লায়েন্টের সাথে দেখা। ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ সাইরেনের শব্দে সচকিত হয়ে উঠলো সুতোমু। হিরোশিমাতে সে তিন মাস এই সাইরেনের শব্দ শুনেনি। করিডোরের কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলো মিত্র বাহিনীর একটা বিমান থেকে নিচের দিকে কী যেনো ফেলা হলো! ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো সকাল ৮ টা ১৫ মিনিট। একটা প্রচন্ড বিস্ফোরনের শব্দ শুনলো সুতোমু, এরপর আর কিছুই মনে নেই।
যখন জ্ঞান ফিরলো, সে নিজেকে আবিষ্কার করলো হাসপাতালের ওয়ার্ডে। আশেপাশে হাজার হাজার মানুষের লাশ, হাজার হাজার আগুনে ঝলসানো মানুষ, আর্তনাদ, হাহাকার আর দৌড়াদৌড়ি। সুতোমু নিজের দিকে তাকালো। সে এক কানে কিছুই শুনতে পাচ্ছে না, শরীরের বাম দিকের উর্ধাংশ পুরোপুরি ঝলসে গেছে, চোখে কম দেখছে। পাশে একজন কোথায় যেনো যাচ্ছিলো, সুতোমু জিজ্ঞেস করলো,
- কি হয়েছে?
- একটা বোমা! ভয়ানক বো্মা!
- একটা বোমা! ভয়ানক বো্মা!
‘আমি বাড়ি যাবো’ বলে সুতোমু হাসপাতাল থেকে বের হয়ে এলো, কেউ তাকে আটকালো না। প্রথমেই সে ডকে এসে দুই সহকর্মীকে খুঁজে বের করলো, তারা তখনো বেঁচে ছিলো, কিন্তু সুতোমুর চেয়েও খারাপ অবস্থা। একজনের একটা হাত উড়ে গেছে, গায়ের চামড়া ঝলসে গেছে, আরেকজনের চোখ নষ্ট হয়ে গেছে। শহরের যেদিকেই তারা যাচ্ছে, সবজায়গাতেই একই অবস্থা। সারি সারি লাশ আর ঝলসানো জীবিত মানুষ। বহু কষ্টে এক ওয়ার শেল্টারে সেদিন রাতে থাকার জন্য তারা জায়গা পেলো।
‘লিটল বয়’ বিস্ফোরনের পর হিরোশিমার যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙ্গে পরলো। কিন্তু এক দিন পর ৮ই আগস্ট সকালে ট্রেন চলাচল শুরু হতেই প্রথম ট্রিপেই সুতোমু নাগাসাকিতে নিজের পরিবারের সদস্যদের কাছে চলে আসলো, পিছনে থাকলো এক বিভীষিকাময় স্মৃতি। জাপান সরকার হিরোশিমার পুরো ঘটনাটাই মিডিয়া থেকে ব্ল্যাক আউট করে দিলো।
কর্তব্যপরায়ণ সুতোমু ওই অবস্থাতেই ৯ই আগস্ট সকালবেলায় মিতসুবিশির অফিসে গেলো বসের কাছে রিপোর্ট করার জন্য। বস সুতোমুকে দেখেই প্রচন্ড ক্ষেপে গেলো। রেগে গিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগলো, ‘কোথায় ছিলে তুমি? তোমার না ৬ তারিখে আসার কথা ছিলো? আসোনি কেনো?’ সুতোমু বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো, ‘আপনি হিরোশিমার বোমার কথা শুনেন নি? ৬ তারিখে বোমা ফেলেছে আর এই যে আমার সারা শরীরে ব্যান্ডেজ লাগানো।’ বস আবারো চেচিয়ে উঠলো, ‘আমি বিশ্বাস করি না তোমার কোনো কথা। ভেবেছো, ব্যান্ডেজ লাগালেই তোমার মিথ্যা কথা বিশ্বাস করবো? কোনো বোমা টোমা কিছুই হয় নি।’ ঠিক সেই সময়ে সুতোমু অফিসের জানালা দিয়ে দেখতে পেলো একটা আমেরিকান বিমান উড়ে যাচ্ছে, আর সাথে সাথেই তিন দিন আগের মতো বিস্ফোরনের শব্দ শুনতে পেলো। ঘড়িতে তখন বাজে সকাল ১১ টা ১ মিনিট।
পরিশিষ্টঃ আজ ৬ই আগস্ট। ১৯৪৫ সালের এই দিনে মিত্রবাহিনী জাপানের হিরোশিমাতে প্রথম আণবিক বোমা ফেলে, এর তিনদিন পর ৯ই আগস্টে আবারো একই ধরনের বোমা ফেলা হয় নাগাসাকিতে। বোমা ফেলার প্রথম দুই থেকে চার মাসের মধ্যে ৯০,০০০ থেকে ১৬৬,০০০ লোক হিরোশিমাতে এবং ৬০,০০০ থেকে ৮০,০০০ লোক নাগাসাকিতে মারা যান, তন্মধ্যে প্রায় অর্ধেক লোকই মারা যান প্রথম দিনে। হিরোশিমাতে প্রায় ৭০,০০০ লোক আহত হয় এবং প্রায় ৯০% ডাক্তার ও ৯৩% নার্স মারা যাওয়াতে মৃত্যুর সংখ্যা আরো বেড়ে যায়। আরো ২০০,০০০ লোক ১৯৫০ সালের মধ্যে মারা যায় রেডিয়েশনের কারণে ক্যান্সার ও অন্যান্য প্রতিক্রিয়ায়। যারা এই বোম্বিং থেকে বেঁচে যায়, তাদেরকে বলা হয় ‘হিবাকুশা’ (Hibakusha- a Japanese word that literally translates to ‘explosion-affected people’.) ২০১০ সালের ৩১মার্চ পর্যন্ত জাপান সরকার কর্তৃক স্বীকৃ্ত ২২৭,৫৬৫ জন হিবাকুশা জীবিত ছিলেন। আর যারা হিরোশিমা এবং নাগাসাকির দুইটি বোম্বিং থেকেই বেঁচে যায়, তাদেরকে বলা হয় nijū hibakusha বা ‘ডাবল সারভাইভর’। ২০০৯ সালের ২৪ মার্চ, জাপান সরকার আমাদের এই গল্পের নায়ক সুতোমু ইয়ামাগুচি(Tsutomu Yamaguchi)-কে একমাত্র nijū hibakusha বা ‘ডাবল সারভাইভর’ হিসেবে স্বীকৃ্তি দেয়। তিনি ২০১০ সালের ৪ জানুয়ারী পাকস্থলীর ক্যান্সারে ৯৩ বছর বয়সে মারা যান। অবশ্য ২০০৬-এর একটি ডকুমেন্টারীতে nijū hibakusha বা ‘ডাবল সারভাইভর’ হিসেবে ১৬৫ জনের কথা বলা হয়েছে।
সুতোমু ইয়ামাগুচি(Tsutomu Yamaguchi)-একমাত্র nijū hibakusha বা ‘ডাবল সারভাইভর’
জেনে ভালো লাগল !
উত্তরমুছুনধন্যবাদ অনিন্দ্য।
উত্তরমুছুনখুব ভালো থাকো।