(১)
ইত্তেফাক-বাংলাদেশের বর্তমানে প্রচলিত দৈনিক জাতীয় পত্রিকাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন এবং সবচেয়ে সম্ভ্রান্তশালী পত্রিকা। একটা সময় দেশের যারা পত্রিকা পড়তেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকের কাছে ইত্তেফাক দেখা যেতো। আমি যখন ছোট ছিলাম, বাসাতে হকার ইত্তেফাক দিয়ে গেলেই হুমরি খেয়ে এডগার রাইজ বারোসের ‘টারজান’ পড়তাম। এখনো প্রথম আলো বা কালের কন্ঠের যুগে ইত্তেফাকের গ্রাহক সংখ্যা রীতিমত ঈর্ষাজনক। মাঝে অবশ্য ইত্তেফাক ভবন দখল করা নিয়ে বা এর মালিকানার ঝামেলাতে মৃত্যু পর্যন্ত হওয়াতে এর গ্রহনযোগ্যতা সাময়িকভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়।
ইত্তেফাক সম্পর্কে আমরা কতটুকু জানি, কতটুকু জানি এর ইতিহাস সম্পর্কে? ‘চতুর্মাত্রিক’-এ বেশ কিছুদিন আগে নাজমুল ভাইয়ের ভাসানী সম্পর্কে একটা লেখায় প্রথম জানতে পারলাম এক অন্যরকম তথ্য। অসুস্থ অবস্থায় ভাসানী তাঁর এক শিষ্যকে ইত্তেফাক তাঁর কাছ হতে কেড়ে নেবার কথা বলছিলেন। এরপর এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে গিয়ে দেখা যায় ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ও ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নাম লেখা ছিলো।
১৯৫২ সালের ইত্তেফাক (লাল চিহ্নিত দাগের উপরে প্রতিষ্ঠাতার নামঃ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী)
(২)
ভাষাকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগ দ্রুত জনপ্রিয়তা হারালে মুসলীম লীগকে মোকাবেলা করার জন্য একটা পত্রিকার প্রয়োজন হয়। এই লক্ষ্য নিয়েই ১৯৪৯ সাল থেকে মাওলানা ভাসানী ইত্তেফাক প্রকাশ করতেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৫৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর ইত্তেফাককে নতুন আঙ্গিকে রুপ দেন মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান, যিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগেরও প্রতিষ্ঠাতা কোষাধাক্ষ্য ছিলেন। তখন ইত্তেফাক প্রকাশিত হতো সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে। যেহেতু ভাসানী এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান, দুইজনেই রাজনীতি এবং পাকিস্তান-বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তরুন উদীয়মান সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেনকে সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেন। তোফাজ্জল হোসেন সেই সময়ে কোলকাতাতে সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ছিলেন।
পাকিস্তান আমলে, ইত্তেফাকে পাকিস্তানের নেতাদের পূর্ব পাকিস্তান সম্পর্কে উদাসীনতা, সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জোরালো সমালোচনা করা হতো। ফলশ্রুতিতে, এর সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা সরকারের রোষানলে পড়তো। তোফাজ্জল হোসেনের সম্পাদকীয় ‘রাজনৈতিক হালচাল’ ও 'মঞ্চ নৈপথ্যে' (মুসাফির ছদ্মনামে লিখতেন) সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে বিপুল পাঠক প্রিয়তা পায়। এই সময়টাতেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ইত্তেফাক সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক পত্রিকায় রুপান্তরিত হয়। ইত্তেফাক ভবনটি কিনতেও সোহরাওয়ার্দী অর্থ সাহায্য দেন। ১৯৫৪ সালের দিকে সাধারণ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিপুল বিজয়ে ইত্তেফাক এক বিশাল ভূমিকা রাখে। ১৯৫৮ সালের দিকে তোফাজ্জল হোসেন পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রকাশকের নাম পরিবর্তন করে নিজের নাম ব্যাবহার করা শুরু করেন। কিভাবে এটা সম্ভব হলো, এটা জানতে না পারলেও এটুকু জানা গেছে, সেই সময়ের এই পরিবর্তন রাজনৈতিক কারণে হয়েছিলো এবং এতে আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের সমর্থন ছিলো।
পরবর্তীতে ইত্তেফাক বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা দাবীর প্রতি সমর্থন দেয় এবং তা জনগনের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে ব্যাপক ভুমিকা রাখে। অচিরেই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের কন্ঠস্বর হিসেবে ইত্তেফাক পরিগনিত হতে থাকে। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬৬ সালের ১৭ই জুন থেকে ১১ই জুলাই এবং পুনরায় ১৭ই জুলাই, ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত দুই দফায় ইত্তেফাকে সেন্সরশীপ আরোপ করে এবং সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেনকে কয়েক দফায় কারাদন্ড দেওয়া হয়।
১৯৬৯ সালের ১লা জুন তোফাজ্জল হোসেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই সন্তান মইনুল হোসেন এবং আনোয়ার হোসেন ইত্তেফাক পরিচালনা করতে থাকেন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ ইত্তেফাক অফিস ভবন পুড়িয়ে দেওয়া হলে ২১শে মে পর্যন্ত ইত্তেফাক প্রকাশিত হতে পারে নি। এরপর পাকিস্তান সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে ইত্তেফাক প্রকাশিত হতে থাকে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা পর ১৯৭৫ সালের ১৭ই জুন ইত্তেফাককে জাতীয়করণ করা হয়, এর প্রধান সম্পাদক করা হয় নুরুল ইসলাম পাটোয়ারীকে এবং প্রকাশিত হতে থাকে নিউ নেশন প্রেস, ১নং রামকৃষ্ণ মিশন রোড থেকে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পটভুমিতে ইত্তেফাকের মালিকানা ১৯৭৫ সালের ২৪শে আগস্ট তোফাজ্জল হোসেনের দুই ছেলেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
(৩)
কিছু কথাঃ
সম্ভবত ইত্তেফাকের ৪০ বছর বা এরকম এক পূর্তিতে বিশেষ ম্যাগাজিন বের করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সে সময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রস্তাব নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন তাহলে তো আসল ইতিহাস লিখতে হবে। তার চেয়ে কিছু না করাই ভাল। সেই আসল ইতিহাস পূর্নাঙ্গভাবে আমরা এখনো জানি না। কোনো জায়গাতেই কিভাবে ইত্তেফাকের মালিকানা পরিবর্তন হলো সেটা জানা যায় না। যতদূর জানা যায়, সেই সময়ে মামলাও করা হয়েছিলো। মামলায় কি রায় হয়েছিলো, খুঁজে পাওয়া যায় নি। আগ্রহীরা চেষ্টা করে দেখতে পারেন।
ইত্তেফাকের সূচনাপর্ব থেকে শুরু করে উত্থানপর্ব পর্যন্ত শেখ মুজিবের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। পরাধীন জনপদে এই কাগজটির সকল বিকাশ ধারায় অন্য অনেকের সাথে আওয়ামী প্রধানের ভূমিকা ইতিহাস হয়ে আছে। ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া আর শেখ মুজিবুর রহমান দু’জনই ছিলেন আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনের স্বাপ্নিক। রাজনৈতিক নানা মতান্তর থাকলেও মানিক মিয়া ইত্তেফাক নিয়ে সবসময়ই দেশের তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও তার প্রধানের পাশে ছিলেন।
৭৫-এর ১৫ আগস্ট রক্তাক্ত পটপরিবর্তনের পর ১৬ আগস্ট দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছিল, ‘গতকাল ছিল গতানুগতিক জীবনধারায় একটি ব্যতিক্রম। চলার পথে শক্তি সঞ্চয়ের দিন। তাই আমাদের জাতীয় জীবনে একটি ঐতিহাসিক দিন। দেশের প্রবীণ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী দেশের ভার গ্রহণ করিয়াছে। প্রত্যুষে বেতারে এই ঘোষণা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনগণ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলিয়া একটি আকাক্সিক্ষত সূর্যরাঙা প্রভাত দেখিতে পায়। মনের ভাব প্রকাশের জন্য রাস্তায় নামিয়া পড়ার ইচ্ছা থাকিলেও শান্তিপ্রিয় জনগণ নয়া সরকারের নির্দেশ লঙ্ঘন করে নাই।’ ওই সময় ইত্তেফাকের কর্ণধার ছিলেন মানিক মিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন