- রোমান আক্রমন ও রোমের অধীনে ব্রিটেনঃ
“আমার নাম সীজার, এবং আমি এই ভূমিকে রোমের নামে দাবী করলাম”- জুলিয়াস সীজার
ব্যবসা বানিজ্যের কারণে পূর্ব থেকেই ব্রিটেন রোমের কাছে পরিচিত ছিলো। কিন্তু্ ব্রিটেনে প্রথম রোমান অভিযান হয় ৫৫ ও ৫৪ খ্রীঃপূঃ-এ, যখন জুলিয়াস সীজার গল দখল করার সময় ধারণা করেন ব্রিটনরা গালিক প্রতিরোধকারীদের সাহায্য করছে। প্রথম আক্রমনে সীজার কেন্টের সৈকতে আসেন কিন্তু জাহাজের ক্ষতি হওয়ায় ও কম পদাতিক সৈন্য থাকায় ফিরে যান।
Trinovantes (বর্তমানের এসেক্স এবং সাফল্ক) নামে এক লোকাল সেল্টিক গোষ্ঠীর রাজা ছিলেন ইমানুয়েন্টিয়াস, যাকে খুন করে্ন ক্যাসিভেল্লাওনাস নামে একজন গোষ্ঠী নেতা। ইমানুয়েন্টিয়াসের ছেলে মান্ডুব্রাকাস গলে গিয়ে জুলিয়াস সীজারের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলে ৫৪ খ্রীঃপূঃ-এ জুলিয়াস সীজার আবার বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ব্রিটেন আক্রমন করেন এবং অনেক সেল্টিক সম্প্রদায়কে শান্তির বিনিময়ে কর দিতে বাধ্য করেন। তিনি যুদ্ধে ক্যাসিভেল্লাওনাসকে পরাজিত করে মান্ডুব্রাকাসকে রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে আসেন।
সীজার কোনো জায়গা দখল করেন নি বা কোনো সৈন্যবাহিনীও ব্রিটেনে রেখে আসেন নি কিন্তু্ ব্রিটেনের রাজনীতিতে রোমের প্রভাব শুরু হয় এরপর থেকেই, বিশেষ করে দক্ষিন ইংল্যান্ডের দুইটি শক্তিশালী রাজ্য Catuvellauni (বর্তমানের হার্টফোর্ডশায়ার, বেডফোর্ডশায়ার, দক্ষিন ক্যাম্ব্রিজ এবং ভারলামিওন শহরের আশেপাশের এলাকা, ক্যাসিভেল্লাওনাস ছিলেন এই গোষ্ঠীর নেতা) এবং Atrebates (বর্তমানের হ্যাম্পশায়ার, পশ্চিম সাসেক্স, সারে এবং সিলচেষ্টার)-এর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে রোম এক বিশাল ভূমিকা রাখে।
এরপর ৪০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে Catuvellauni –এর রাজা কিউনোবেলিনাস, তার পুত্র এডমিনিয়াসকে নির্বাসনে পাঠালে প্রথম বারের মতো রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা ব্রিটেন অধিকারের চিন্তা করেন। ক্যালিগুলার মৃত্যুর পর কিউনোবেলিনাসের আরেক পুত্র ক্যারাট্যাকাস তার চাচার সাথে Atrebates দখল করলে Atrebates-এর রাজা ভেরিকা রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের সাহায্য প্রার্থনা করেন এবং ৪৩ খ্রীস্টাব্দে ক্লডিয়াস ব্রিটেন দখলে সৈন্যবাহিনী পাঠান।
আউলাস প্লটিয়াসের অধীনে রোমান বাহিনী Catuvellauni এবং তাদের মিত্রদেরকে দুইটি যুদ্ধে পরাজিত করে এবং ক্যারাট্যাকাস Silures (একটি শক্তিশালী ও যুদ্ধবাজ গোষ্ঠী, বর্তমানের দক্ষিন ওয়েলসের মনমাউথশায়ার, ব্রেকনশায়ার ও গ্লামোরগানশায়ার কাউন্টি এবং ইংল্যান্ডের গ্লচেষ্টারশায়ার ও হেরেফোর্ডশায়ার)-এ পালিয়ে যান। Silures এবং Ordovices (বর্তমানের ওয়েলস)-এর রাজাদের সাহায্য নিয়ে ক্যারাট্যাকাস আবার গেরিলা যুদ্ধ শুরু করে্ন এবং ৫১ খ্রীস্টাব্দে পরাজিত হয়ে এবার Brigantes (বর্তমানের ইয়র্কশায়ার)-এ পালিয়ে গেলে Brigantes-এর রানী কারটিমান্ডুয়া রোমান বাহিনীর হাতে ক্যারাট্যাকাসকে ধরিয়ে দেন। ক্যারাট্যাকাসকে বন্দী করে রোমে নিয়ে যাওয়া হয় এবং এরপর রোমান বিরোধী যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় কারটিমান্ডুয়ার প্রাক্তন স্বামী ভেনুটিয়াস।
Figure 5: রোমে সম্রাট ক্লডিয়াসের সামনে বন্দী ক্যারাট্যাকাস--অপরিচিত শিল্পী, ১৮শ শতক
রোমান সম্রাট নীরোর সময়ে ৬০-৬১ খ্রীস্টাব্দে Iceni (বর্তমানের নরফোল্ক)-এর সদ্য মৃত রাজা প্রাসুটাগাসের বিধবা পত্নী বৌডিকার (Boudica) অধীনে এক বড় বিদ্রোহ দেখা দেয়। বৌডিকার স্বামী প্রাসুটাগাস রোমের মিত্র হিসেবে স্বাধীনভাবে Iceni শাষন করতেন। তিনি উইল করে গিয়েছিলেন যে, তার মৃত্যুর পর তার দুই মেয়ে এবং রোম সম্রাট যৌথভাবে Iceni শাষন করবে কিন্তু রোমানরা প্রাসুটাগাসের এই ইচ্ছাকে মূল্য না দিয়ে তার স্ত্রী বৌডিকাকে প্রকাশ্যে অপমান করে এবং দুই মেয়েকে ধর্ষন করে। বৌডিকা পালিয়ে গিয়ে Iceni-এর মানুষকে সাথে নিয়ে এবং Trinovantes রাজ্যের সাহায্যে রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। প্রথম দিকের যুদ্ধে বৌডিকা জয়লাভ করলেও, পরবর্তীতে বৌডিকা পরাজিত হোন এবং আত্মহত্যা করেন। বৌডিকার সাফল্যের প্রথমদিকে সম্রাট নীরো ব্রিটেন থেকে রোমান সৈন্য সরিয়ে নেবার কথা চিন্তা করছিলেন।
Figure 6: রানী বৌডিকা
৬৯ খ্রীস্টাব্দে রোমে অরাজক অবস্থার সৃষ্টি হলে (চার সম্রাটের বছর)ব্রিটেনের দুর্বল রোমান গভর্নর সৈন্যবাহিনীকে নিয়ন্ত্রন করতে ব্যর্থ হোন, ফলে Brigantes-এর রানী কারটিমান্ডুয়ার সাবেক স্বামী ভেনুটিয়াস বিদ্রোহ ঘোষনা করেন এবং উত্তর ব্রিটেন স্বাধীনভাবে শাষন করতে থাকেন। রোমের অরাজক অবস্থার অবসানের পর ভেসপাসিয়ান সম্রাট হলে Brignates রোমের অধীনে আসে। পরবর্তী বছরগুলোতে রোমান বাহিনী ব্রিটেনের আরো জায়গা দখল করতে থাকে। ৮৪ খ্রীস্টাব্দে রোমান গভর্নর এগরিকোলা Caledonians (বর্তমানের স্কটল্যান্ড) দখল করেন। বিজয়ের পরেই এগরিকোলাকে রোমে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং স্কটল্যান্ডের উত্তরে আর কোনো জায়গা দখল করা হয় নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে Picts (স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা)-রা পাল্টা আক্রমন করলে রোমান সম্রাট হ্যাড্রিয়ানের সময় ১২২ খ্রীস্টাব্দে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা হিসেবে বিখ্যাত Hadrian’s Wall-এর নির্মান কাজ শুরু হয়।
Figure 7: হ্যাড্রিয়ানের দেয়াল
রোমান সম্রাট এন্টোনিনাস পিয়াস ১৪২ সালে হ্যাড্রিয়ান ওয়ালের আরো উত্তরে আরেকটি প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল তৈরী করেন যা Antonine Wall-নামে পরিচিত। কিন্তু ১৫৫-১৫৭ খ্রীস্টাব্দে Brignates-রা আবারো বিদ্রোহ করলে রোমান গ্যারিসন হ্যাড্রিয়ান ওয়ালের দক্ষিনে ফিরে আসে এবং ১৬৩ বা ১৬৪ খ্রীস্টাব্দের দিকে এন্টোনাইন ওয়াল পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
Figure 8: হ্যাড্রিয়ান ওয়াল এবং এন্টোনাইন ওয়াল
এরপরে বিভিন্ন সময়ে ব্রিটেনের রোমান বাহিনীর মধ্যেই গভর্নরদের বিরুদ্ধে (যেমনঃ উল্পিয়াস মার্সেলাসের বিরুদ্ধে) বিদ্রোহ হতে থাকে এবং একই সময়ে রোমের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্রিটেন বা ব্রিটানিয়ার কোনো কোনো গভর্নররা রোমের অধীনতা অস্বীকার করে (যেমনঃ প্রিস্কাস), আবার কেউ কেউ (যেমনঃ ক্লডিয়াস এলবিনাস) সম্রাট হবার জন্য রোম অভিমুখেও যাত্রা করে। এই অবস্থায় বিভিন্ন সেল্টিক গোষ্ঠী, পিক্টস এবং স্কটরা বারবার রোমানদের আক্রমন করে দুর্বল করতে থাকে। এইভাবে তৃতীয় শতাব্দী পর্যন্ত চলতে থাকে। রোমান সম্রাট সেপ্টিমিয়াস সেভেরাস রোমে তার শাষন ক্ষমতা সুদৃঢ় করে ব্রিটানিয়াতে অভিযানে এলে সেল্টিক গোষ্ঠীগুলো পরাজিত হতে থাকে এবং ব্রিটানিয়াতে রোমান আধিপত্য আবারো বৃদ্ধি পায়। সেভেরাস ব্রিটানিয়ার গভর্নররা যাতে আর বিদ্রোহ করতে না পারে সেজন্য ব্রিটানিয়াকে আপার ব্রিটেন এবং লোয়ার ব্রিটেনে বিভক্ত করেন। এই সময়ের দিকেই স্যাক্সনরা জার্মানী এবং বেলজিয়াম থেকে ব্রিটেনে এসে বসতি স্থাপন করতে থাকে।
তৃতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে রোমান সাম্রাজ্যে বারবারিয়ান (Barbarian invasion) আক্রমন হতে থাকে, বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দেয়, এমন কি রোম সাম্রাজ্য ভেঙ্গে কিছু অংশ নিয়ে নতুন সাম্রাজ্যও গঠিত হতে থাকে। গালিক সাম্রাজ্য এরকম একটি সাম্রাজ্য। ২৫৯ থেকে ২৭৪ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ব্রিটানিয়া গালিক সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো। ২৭৪ সালে রোমান বাহিনী গালিক সাম্রাজ্যকে যুদ্ধে পরাজিত করে এবং ব্রিটানিয়া আবারো রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে চলে আসে।
২৮৬ খ্রীস্টাব্দে গভর্নর ক্যারাওসিয়াস রোমান সম্রাট ম্যাক্সিমিয়ানের রাজত্বকালে বিদ্রোহ ঘোষনা করেন এবং ব্রিটানিক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। ২৯৩ খ্রীস্টাব্দে রোমান সম্রাট কন্সটানটিয়াস ক্লোরাস বিদ্রোহ দমনে ব্রিটেনে আসেন এবং ক্যারাওসিয়াস তার অর্থমন্ত্রীর হাতে খুন হলে এই ব্রিটানিক সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘটে। সম্রাট কন্সটানটিয়াস ক্লোরাস ব্রিটেনকে আবার চার ভাগে বিভক্ত করে চারজন গভর্নর নিয়োগ দেন, ফলে ব্রিটেনের গভর্নরদের রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সাময়িক অবসান ঘটে।
৩৬০ খ্রীস্টাব্দের দিকে উত্তর দিক থেকে পিক্টস, এটটাকোট্টি, স্কটস, স্যাক্সন এবং দরিদ্র ব্রীটনদের ক্রমাগত আক্রমন শুরু হয়। জেনারেল থিওডোসিয়াস (পরবর্তীতে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট) পিক্টস এবং স্কটসদের ৩৬৯ খ্রীস্টাব্দে ব্রিটানিয়ার বাইরে পর্যন্ত তাড়া করেন। কিন্তু ৩৮৩ খ্রীস্টাব্দে ম্যাগনাস ম্যাক্সিমাস নামে একজন স্পানিয়ার্ড ব্যক্তি ব্রিটেনের রোমান গ্যারিসনের সাহায্যে নিজেকে ব্রিটেনের সম্রাট ঘোষনা করেন এবং দ্রুত গল, স্পেন এমন কি রোম পর্যন্ত দখল করেন। সেই সময়ে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের (রোমান সাম্রাজ্য ততদিনে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিলো) সম্রাট থিওডোসিয়াস ৩৮৮ খ্রীস্টাব্দে যুদ্ধে ম্যাক্সিমাসকে পরাজিত করেন এবং ব্রিটেনের গ্যারিসনের যারা ম্যাক্সিমাসকে সাহায্য করেছিলো, তাদেরকে সমূলে নিশ্চিহ্ন করেন। ফলে পিক্টস, স্কটস এবং স্যাক্সনদের আক্রমন থেকে ব্রিটানিয়াকে রক্ষা করার জন্য নিয়োজিত রোমান বাহিনীর প্রচুর সৈন্য মারা যায় এবং ব্রিটানিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
থিওডোসিয়াসের মৃত্যুর পর তার ছেলে হনোরিয়াস পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হোন (থিওডোসিয়াসের আরেক ছেলে আরকাডিয়াস পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট হোন)। ৪০২ খ্রীস্টাব্দের দিকে রোম এলারিক এবং ভিসিগথদের দ্বারা আক্রান্ত হলে হনোরিয়াস ব্রিটেন থেকে সৈন্য নিয়ে আসেন। এইসব সৈন্যরা ভিসিগথদের পরাজিত করলেও আর ব্রিটেনে ফিরে যেতে পারে নি, রোমের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য। ৪০৬ সালের দিকে বিভিন্ন বারবারিয়ান জাতি গলের দিকে আক্রমন করলে ব্রিটেনের সাথে রোমের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ব্রিটেনে থাকা রোমের অবশিষ্ট সৈন্যরা আবারো বিদ্রোহ করে। কন্সটানটাইন নামের একজন সৈন্য কন্সটানটাইন তৃতীয় নামধারণ করে ৪০৭ খ্রীস্টাব্দে নিজেকে ব্রিটানিয়ার সম্রাট ঘোষনা করেন এবং ব্রিটানিয়ার অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে গলে যান, যুদ্ধে হনোরিয়াসের কাছে কন্সটানটাইন তৃতীয় পরাজিত হোন। যুদ্ধের পর কত সৈন্য ব্রিটানিয়াতে ফেরত এসেছিলো বা ব্রিটানিয়াতে নতুন কোনো গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছিলো কী না তা পরিস্কারভাবে জানা যায় নি।
৪০৮ সালের দিকে ব্রিটানিয়াতে কোনো রোমান সৈন্য না থাকাতে ব্রিটনরা বহিরাগত পিক্টস, স্কটস এবং স্যাক্সনদের ক্রমাগত আক্রমনের স্বীকার হতে থাকে। এক পর্যায়ে ব্রিটনরা এবং ব্রিটেনে বসবাসরত সিভিলিয়ান রোমানরা সম্রাট হনোরিয়াসের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে সম্রাট সৈন্যবাহিনী পাঠাতে অস্বীকার করেন। ফলে ক্রমাগত আক্রমনের মুখে দিশেহারা হয়ে ব্রিটনরা ব্রিটেনে নিয়োজিত দুর্বল রোমান প্রশাসনিক অফিসারদের ক্ষমতাচ্যুত করে এবং নিজেরাই স্যাক্সনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকে। এভাবেই ৪১০ খ্রীস্টাব্দের দিকে ব্রিটেনে রোমান শাষনের অবসান ঘটে।
Figure 9: রোমান ব্রিটেনের মানচিত্র
ব্রিটেনে রোমান শাষনের প্রভাবঃ
ব্রিটেনে রোমান শাসন তিনশ’ বছরেরও বেশি সময় ধরে স্থায়ী ছিল। এটি ব্রিটেনের জন্য অনেক ভালোর পাশাপাশি কিছু মন্দও বয়ে নিয়ে এসেছিল।
রোমানরা তাদের বিজিত ব্রিটনদের প্রশাসনিক কাজে নিয়োজিত করে। প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো বিজিত গোষ্ঠীগুলোর এলাকা অনুযায়ী গঠিত হতো এবং গোষ্ঠীগুলোর সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের কোনো প্রশাসনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহনের অধিকার ছিলো। তারা তাদের বিজিত ব্রিটনদের একটা রোমান ফ্রেমের মধ্যে নিয়ে এসেছিলো, যা সভ্যতার উন্নতির জন্য সহায়ক ছিলো।
রোমানরা তাদের আর্মি গ্যারিসনের পাশেই শহর প্রতিষ্ঠা করতে ব্রিটনদের উৎসাহিত করেছিলো এবং অবসরপ্রাপ্ত সৈন্যদের জন্য বিশেষ শহরও প্রতিষ্ঠা করেছিলো। তারা স্থানীয় সেল্টিক সম্ভ্রান্তদের নিয়ে পরিষদ গঠন করতো, যারা শহরের ব্যবসায়িক কর্মকান্ড নিয়ন্ত্রন করতো। রোমানরা সাধারণত নিচু ভূমিতে শহরগুলি প্রতিষ্ঠা করতো (নিওলিথিক এবং লৌহ যুগের বিপরীত), বেশীরভাগ শহরগুলোর চারপাশ শক্ত ইট পাথরের তৈরি দেয়ালে ঘিরে দেওয়া হতো। লন্ডন, ম্যানচেষ্টার, ইয়র্কের মতো বড়ো বড়ো শহর রোমানদেরই তৈরী।
প্রতিটি শহরেই নাগরিক গোসলখানা ছিলো। গোসলখানাগুলো ছিলো রোমান প্রতিষ্ঠান এবং শহরের স্থায়ী নাগরিকরা সাধারণত সান্ধ্য খাবারের আগে সেখানে যেতো। এটা পুরুষ এবং মহিলা উভয় শ্রেনীর জন্যই খোলা থাকতো, তবে দিনের নির্দিষ্ট দুই সময়ে। গোসলখানাগুলো একাধারে স্বাস্থ্য ক্লাব ও দেখা করার জায়গা হিসেবেও ব্যবহৃত হতো।
কিছু কিছু শহরে নাগরিকদের মনোরঞ্জনের জন্য থিয়েটার এবং এম্ফিথিয়েটাররের ব্যবস্থাও ছিলো। থিয়েটারগুলো সাধারণত উন্মুক্ত হতো এবং সেখানে ক্ল্যসিকাল নাটক এবং ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন হতো। আর এম্ফিথিয়েটারগুলোতে গ্লাডিয়েটরদের যুদ্ধ, মানুষ আর পশুর মধ্যে লড়াই এবং প্রকাশ্যে ফাসিঁর ব্যবস্থা হতো। ব্রিটেনে এই এম্ফিথিয়েটারের সংখ্যা খুব কম থাকাতে এই জিনিসগুলো সেখানে তেমন জনপ্রিয়তা পায় নি।
রোমানরা দেশের বিভিন্ন স্থানকে সংযুক্ত করতে কঠিন মসৃণ সড়ক তৈরি করল। সে সড়কগুলো এত ভালভাবে তৈরি ছিল যে রোমানরা চলে যাওয়ার শত শত বছর পরেও সেগুলো এখনও যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তারা প্রায় ৯৬০০ কিলোমিটারের মতো রাস্তা তাদের সময়কালে তৈরী করেছিলো।
রোমানরা ব্যবসা বাণিজ্য উৎসাহিত করেছিল, খনি খুঁজে বের করেছিল, মৎস্য শিকার এলাকা তৈরি করেছিল, আঙ্গুর ও ফলের বাগান করেছিল, জলাভূমিতে নালা কেটেছিল, ঘন বনাঞ্চল কেটে পাতলা করেছিল। তারা এত বেশি শস্য উৎপাদন করেছিল যে ব্রিটেনকে বলা হত ‘ইউরোপের শস্যভাণ্ডার’। তারা ব্রিটিশ প্রধানদেরকে রোমান ও ল্যাটিন ভাষা এবং রোমান জীবনাচরণ শিখতে উদ্বুদ্ধ করেছিল।
ব্রিটেনে রোমান শাসনের শেষ দিকে রোমানরা প্রায় সবাই খ্রিস্টান হয়ে গিয়েছিল। তারা ব্রিটেনে নতুন ধর্ম বিশ্বাস নিয়ে এসেছিল। ব্রিটিশ চার্চ তার নিজস্ব যাজক ও পুরোহিত সহ অনেক দেব দেবীর উপাসনা বন্ধ করল যাতে এক সময় ব্রিটনরা অভ্যস্ত ছিল। আজকের ওয়েলস চার্চ সেদিনের ব্রিটিশ চার্চ হতে উদ্ভূত। আনন্দ সংবাদ প্রচারের জন্য রোমান প্রদেশের বাইরে প্রেরিত ধর্ম প্রচারক দল হতেই আইরিশ চার্চ উদ্ভূত । সবচেয়ে বিখ্যাত সাধক যিনি পুরো আয়ারল্যান্ডে নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন তিনি হলেন “ব্রিটন পেট্রিক” যাকে আজো আইরিশরা ত্রাণকর্তা হিসেবে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে। যদিও আয়ারল্যান্ড কখনো রোমানদের দ্বারা বিজিত হয়নি তবুও তারা রোমান ব্রিটেনের কাছ থেকেই প্রথম খ্রিস্ট ধর্মের শিক্ষা গ্রহণ করে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন