দিপু চুপচাপ ডক্টরস রুমে বসে আছে। রাত একটা বাজে। একটু আগে এক রোগী মারা
গিয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনার রোগী। বয়স্ক পুরুষ, পঞ্চাশ
থেকে ষাটের মধ্যে বয়স হবে। পরনে খাকি রঙের লুঙ্গি, সাদা পাঞ্জাবী। দিপু
পরীক্ষা করার সময় খেয়াল করেছে ডান হাতার বগলের দিকে একটা ছোট ছিদ্র আছে। সাদা
পাঞ্জাবীর জায়গায় জায়গায় ছোপ ছোপ রক্ত। মাথার দিকে একটা অংশ দেবে গেছে। কপালের
অনেকটা জায়গা খুবলে গেছে।
সন্ধ্যার দিকে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটি মাইক্রোবাস লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে
চলে গেছে। আশেপাশের লোকজন সচকিত হবার আগেই
মাইক্রোবাসের চালক ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে। এমনিতেই মহাসড়কের পাশে ছোট্ট
একটা বাজার। লোকটার সাথে কিছুই ছিলো না। দুর্ঘটনা হবার পর যারা এসেছিলো তারা কেউ
লোকটিকে চিনতেও পারলো না। চেনার চেষ্টা করতে করতেই কিছু সময় চলে গেলো। তারপর কি
মনে করা দু’তিনজন যুবক ছেলে একটা ভ্যানে করে লোকটাকে হাসপাতালে নিয়ে এলো। কিছুক্ষণ
পরেই ছেলেগুলোর আর খোঁজ পাওয়া গেলো না।
ইমার্জেন্সী বিভাগের ডাক্তার পোড় খাওয়া, অভিজ্ঞ। এরকম অবস্থার সম্মুখীন
অনেকবার সে হয়েছে। সহজেই বুঝতে পারলো এই লোকের আত্নীয়-স্বজনের খবর পাওয়া অনেক
কষ্টকর হবে। প্রথমে সে ভর্তিই করাতে চায়নি, কিন্তু যেহেতু সে একটি মেডিকেল কলেজ
হাসপাতালের ইমার্জেন্সী ডাক্তার, মাথায় আঘাতের জন্য নিউরোসার্জারীর জুনিয়র ডাক্তার
দিপুকে খবর দিলো।
দিপু যখন দেখতে এলো তখন লোকটির কোনো জ্ঞান নেই, আসলে দুর্ঘটনার পর থেকেই
লোকটি অজ্ঞান। লোকটিকে দেখে দিপু নিউরো ওয়ার্ডে ভর্তি করাতে বললো। বিপত্তি ঘটলো
ভর্তির জন্য অগ্রিম টাকা দিতে গিয়ে। টাকা দেবারতো কেউ নেই! হাসপাতালের নিয়ম, কিছু
টাকা অগ্রিম না দিলে রোগী ভর্তি করানো যাবে না। ডক্টরস রুমে দিপু আর ইমার্জেন্সী
ডাক্তার মুখোমুখি বসে আছে। নিঃশব্দ! হঠাৎ করে দেয়ালের ঘড়ির ঘন্টার শব্দে দুইজনেই
যেনো চমকে উঠে। অভিজ্ঞ ইমার্জেন্সী ডাক্তার ‘উফ’ বলে উঠে, “বয়স হয়ে গেছে, তাই মনেই
পড়েনি। আমাদেরতো হাসপাতালের নাইট ম্যানেজারকে ডাকা উচিত ছিলো!”
দিপু কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে ফোনের দিকে হাত বাড়ায়।
ইকবাল সাহেব। রিটায়ার্ড আর্মি মেজর। এই বেসরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে
ভালো মাইনেতেই এসেছে। দেখতে রাশভারী মনে হয়, অবশ্য আর্মির সব লোকদেরই দিপুর কাছে তা মনে হয়। কিন্তু দিপু জানে ইকবাল
সাহেব রাশভারী লোক নয়, আমুদে একজন মানুষ। তাকে দিপুর ভালোই লাগে। সেই রিটায়ার্ড আর্মি
মেজর ইকবাল সাহেব ইমার্জেন্সীতে আসতে আসতেই কিছু সময় ব্যয় করে ফেলেন,
ইমার্জেন্সীতে এসে দুই ডাক্তারের কাছ হতে পুরো ঘটনা শুনতে আরো সময় ব্যয় করেন।
“আর বলবেন না, এইসব ঝামেলার জন্যইতো আমরা আছি। আপনারা ঠিক কাজ করেছেন ভর্তি
করানোর আগে আমাকে খবর দিয়ে। দেখি কী করা যায়!” তিনি কি করা যায় দেখার জন্য একটু
সরে গিয়ে কাকে যেনো ফোন দিলেন। কাছে এসে বললেন, “আপনারা পুলিশে ফোন দিয়েছেন? এটাতো
পুলিশ কেস!” দিপু কিছুটা অসহায় কন্ঠে বলে উঠে, “আপনি পুলিশে খবর দেন, আমাদের বলেন
আমরা রোগীকে ভর্তি করাবো কি না? রোগীর অবস্থা খুব ভালো না।” “ঠিকাছে,ঠিকাছে। ভর্তি
করান, তবে ওয়ার্ডে নিবেন না, ইমার্জেন্সীতেই রাখেন। পুলিশ আসুক,” কথাটা বলেই ইকবাল
সাহেব আবার ফোন হাতে তুলে নিলেন।
দিপু রোগীর কাছে চলে গেলো। এখনো নিশ্বাস নিচ্ছে, শুধু সেটুকুই। কেটে যাওয়া
কপালের দিকে তাকিয়ে সিস্টারকে বললো সেলাই দেবার জিনিসপত্র নিয়ে আসতে। লোকটির মাথার
কাছে বসে ওয়াশ দিয়ে সেলাই করতে শুরু করলো। লোকটিকে দেখে ওর বাবার কথা মনে পড়ে
গেলো, একই রকম বয়স। এই লোকটার মতোই লুঙ্গি আর পাঞ্জাবী পরে। গ্রামে থাকে, ছোট খাট
ব্যবসা করে। দিপু যখন সরকারী মেডিকেল কলেজে চান্স পেলো, ওর বাবার আনন্দ যেনো শেষ
হয় না। সবাইকে বলে বেড়ায়, “আমার ছেলে ডাক্তার! আমার ছেলে ডাক্তার!” দিপু খুব লজ্জা
পায়, ও যে তখনো মেডিকেলে ভর্তিই হয়নি। তারপর কীভাবে যে ছয়টা বছর কেটে গেলো!
ইন্টার্র্নি শেষ করেই এই বেসরকারী মেডিকেল কলেজটার নিউরোসার্জারীতে চাকরী পেয়েছে।
গ্রামে গেলে ওর বাবা এবার সবাইকে বলে বেড়ায়, “আমার ছেলে খুব বড় ডাক্তার!” দিপু
এবারও খুব লজ্জা পায়। হঠাৎ করে আনমনে হেসে উঠে। লোকটির দিকে তাকিয়ে পরম মমতায় কপাল
সেলাই করতে থাকে।
থানা থেকে পুলিশের একজন এস আই এসেছে। ইকবাল সাহেবের সাথে যেনো কি কি কথা
বললো। একবার লোকটির চেহারা দেখেই চলে গেলো। দিপু সেলাই করার রুম থেকেই শুনতে পেলো
এস আই ইকবাল সাহেবকে বলছে, “চলুন ইকবাল সাহেব, একটু চা খেয়ে আসি।” আবার সব চুপচাপ,
শুনশান নিরবতা। শুধু দিপু একমনে লোকটির কপাল সেলাই করে যাচ্ছে।
দিপুর একবার মনে হলো ওর প্রফেসরকে ফোন করে, দিপুর সাথে ওর প্রফেসরের খুব
ভালো সম্পর্ক। দিপু খুব ভালো জানে বা কাজ ভালো করে, যে কারণেই হোক, ওর প্রফেসর ওকে
খুব পছন্দ করে। “স্যার, আপনি কী একটু দেখে যাবেন?” ফোনের অপর প্রান্তে কিছুক্ষণ
সাদা, তারপর ওর প্রফেসর বলে উঠেন, “দেখো, যদি সকাল পর্যন্ত বাঁচাতে পারো, তাহলে
আমি তখন দেখে যাবো। এখন এক দাওয়াতে আছি, আর রোগীর লোককে নেগেটিভ কাউন্সেলিং করে রাখো।”
- -- স্যার, রোগীর লোকই তো
পাওয়া যাচ্ছে না!
- -- ও! তাহলে আর কী করা!
দেখো, কী করতে পারো!
দিপু আর কথা বলতে পারে না, আসলে ওর
কথা বলতে আর ইচ্ছে করে না। অনেকদিন আগের কথা ওর মনে পড়ে গেলো। তখনো ও মেডিকেলে
ভর্তি পরীক্ষা দেয়নি। ওর মায়ের খুব বুকে ব্যথা শুরু হলো। দিপু আর দিপুর বাবা খুব
তাড়াতাড়িই থানা সদরের হাসপাতালে নিয়ে গেলো, তখনো সন্ধ্যা নামেনি। হাসপাতালের
ওয়ার্ড বয় একটা স্যালাইন ঝুলিয়ে দিলো। ডাক্তারকে পেলো না। জানা গেলো, চেম্বারে
আছেন তিনি, এখন আসতে পারবেন না। দিপু ওয়ার্ড বয়ের প্রতি ভরসা না করে ওই সময়েই জেলা
শহরের হাসপাতালের দিকে রওয়ানা দেয়। কিন্তু দূরত্বটা অনেক বেশী! এতটা সময় অপেক্ষা
করতে দিপুর মায়ের ভালো লাগেনি, তিনি কাউকে কিছু না বলেই একদম চুপ হয়ে গেলেন। দিপুর
ডাক্তার হবার জেদের শুরু তখন থেকেই। দীর্ঘশ্বাস ফেললো দিপু। ওর এখন মনে হচ্ছে
ডাক্তার না হলেই মনে হয় ভালো হতো!
দিপু লোকটির দিকে তাকালো। এখনো শুধু নিশ্বাস নিচ্ছে, কিন্তু বুকের উঠা
নামাটা ঠিক স্বাভাবিক নয়। ও হঠাৎ চিন্তায় পড়ে গেলো। মনে করতে পারছে না, সড়ক
দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া লোকদের পোস্ট মর্টেম করা হয় কি না। দিপুর ফরেনসিক মেডিসিনের
টুরের কথা মনে পড়ে গেলো। ওরা যখন ফোর্থ ইয়ারের ছাত্র, সরকারী হাসপাতালের মর্গে
গিয়েছিলো পোস্ট মর্টেম দেখতে। বড় ভাইয়ারা বলেছিলো সেইন্ট আর রুমাল নিয়ে যেতে। ও
বুঝতে পারেনি কেনো, তাই নিয়েও যায় নি। মর্গে যখন ডোম পানিতে ডুবে যাওয়া এক
ব্যক্তির পেট কাটলো, ফুস করে বের হয়ে আসা গন্ধে দিপুর গা গুলীয়ে বমি আসতে চাইলো।
ডোমের মুখ দিয়েও যেনো কী বিভৎস গন্ধ আসছিলো। যখন লোকটার মাথা হাতুড়ি আর বাটাল দিয়ে
ভাঙ্গলো, দিপু সহ্য করতে পারেনি, বমিই করে ফেলেছিলো। পরে কিন্তু দিপু এটা নিয়ে
লজ্জা পায়নি, কারণ সেদিন দুইটা মেয়ে অজ্ঞানই হয়ে গিয়েছিলো। আনমনে হেসে উঠলো
দিপু।
মেডিকেলে প্রথম বর্ষে ডেড বডি কাটতে হয়, তখন ডেড বডিকে বলে ক্যাডাভার।
প্রথম যেদিন ডেড বডি কাটবে, ওদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা হয়ে গিয়েছিলো কে কাটবে
সেটা নিয়ে। ফরমালিনের তীব্র গন্ধ সহ্য করেও ডেড বডির গা ঘেঁষে দাঁড়াতো সবাই। একবার
এক মজার ব্যাপার হয়েছিলো। দিনটা ছিলো ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ওদের সেদিন হৃৎপিণ্ড কাটার
কথা। কিন্তু সেদিন কেউই কাটতে চাইলো না, কিন্তু দিপুর ব্যাপারটা না জানা থাকায়,
সেই হৃৎপিণ্ড কাটলো। এরপর থেকে অনেকদিন পর্যন্ত ক্লাসের মেয়েদের কাছ হতে দিপুকে
‘হার্টলেস’ কথাটা শুনতে হয়েছে, এভাবেই হাড়ে হাড়ে সে ১৪ই ফেব্রুয়ারির মর্মার্থ
বুঝতে পেরেছে। আর সে ছেলেই কি না পোস্ট মর্টেম দেখতে গিয়ে বমি করে দিয়েছে! আবারো
আনমনে হেসে উঠলো দিপু, হাসি মুখেই আবার লোকটির দিকে তাকালো।
লোকটি আর নিশ্বাস নিচ্ছে না!
দিপু এখন চুপচাপ ডক্টরস রুমে বসে আছে। রুমের বাইরে ইকবাল সাহেবের কথা শুনতে
পাচ্ছে, পুলিশের এস আই-এর সাথে ফোনে কথা বলছে। সব কিছু শুনতে না পারলেও ‘বেওয়ারিশ’
শব্দটা ভালো শোনা যাচ্ছে। একটু পরে ইকবাল সাহেবকে দেখা গেলো হাসপাতালের ডিরেক্টরের
সাথে ফোনে কথা বলতে। কাজ যেনো এই মুহূর্তে সব ইকবাল সাহেবের!
*******************
মেডিকেল কলেজে প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের আজ ওরিয়েন্টেশন। বড় বড় নামকরা
প্রফেসরদের খুব গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য শেষে ছাত্র-ছাত্রীদেরকে নিয়ে প্রিন্সিপ্যাল
কলেজ পরিদর্শনে বের হয়েছেন। এনাটমি ডিসেকশন হলে গিয়ে তিনি সবাইকে বলছেন, “এটা
তোমাদের এনাটমি ডিসেকশন রুম। এখানে তোমরা ডেড বডি কাটবে। ডেড বডিকে কখনোই তোমরা
ডেড বডি বলবে না, বলবে ক্যাডাভার। তাদের দেহকে কখনোই অসম্মান করবে না। যা হোক, ওই যে লম্বা টেবিলে একটি ক্যাডাভার দেখছ, সেটা তোমরাই কাটবে, তোমাদের
জন্যই এই ক্যাডাভার আনা হয়েছে।” কিছু উৎসাহী ছাত্র ক্যাডাভারের দিকে এগিয়ে গেলো।
বয়স্ক ব্যাকটি, পঞ্চাশ থেকে ষাটের মধ্যে
বয়স হবে। তারা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, ক্যাডাভারটার কপালে খুব সুন্দর করে একটা
সেলাই দেওয়া আছে!

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন