(১)
ডাক্তার আমি কখনো হতে চাইনি। কিন্তু হতে হয়েছে। হতে হয়েছে ক্যান্সারে
আক্রান্ত মরণপথযাত্রী মায়ের ইচ্ছাকে সম্মান জানাতে গিয়ে। অথচ আমার ডাক্তার হবার
তিনদিন আগে বিধাতা আমার মাকে তার কাছে নিয়ে গেলেন। তিনি আর আমার ডাক্তার হওয়াটা
দেখতে পেলেন না। অনেকে বলেন, তিনি সেখান থেকে আমার সবকিছুই দেখছেন! আমি কখনো
বিশ্বাস করি, কখনো বিশ্বাস করি না।
ডাক্তার হবার পর ইন্টার্র্নিতে আমার প্রথম ডিউটি পড়েছিলো মেডিসিন ওয়ার্ডে।
এক মাসও পার হয় নি। একদিন সিস্টার ডাক্তার রুমে গিয়ে আমাকে খবর দিলো, এক রোগী যেনো
কেমন করছে! আমি ছুটে রোগীর কাছে গেলাম। লিভার ক্যান্সারের রোগী। মহিলা, বয়স
চল্লিশের মতো হবে। আমি গিয়ে দেখি মহিলার gasping (বাংলা বোধহয় - শেষ মুহূর্তের
শ্বাসকষ্টের মতো) হচ্ছে, নাক এবং মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। আমি থমকে গেলাম, রোগীর
পাশে গিয়ে নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলাম। সিস্টাররা আমার দিকে তাকিয়ে আছে order-এর জন্য,
অথচ আমি মূর্তিমান এক পাথর! শেষ পর্যন্ত কিছুই বলতে পারলাম না! রোগী মারা যাবার পর
আমি ডক্টরস রুমে এসে হুড়মুড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম। সিস্টার- ইন- চার্জ রুমে এসে আমাকে
সান্তনা দিয়ে বলছেন, “আপনি কিছু করলেও তাঁকে বাঁচাতে পারতেন না। মন খারাপ করার
কিছু নেই।”
কিন্তু আমি জানি, আমি কেনো কিছু বলতে পারিনি, আমি জানি কেনো আমি হুড়মুড়িয়ে
কেঁদেছিলাম! আমার যে আমার মায়ের শেষ সময়ের দৃশ্যের কথা মনে পড়ছিলো! সেই প্রথম, সেই
শেষ! এরপর আর কখনো মায়ের মৃত্যু দৃশ্য মনে করার চেষ্টা করিনি !
(২)
আমি সপ্তাহে তিনদিন ঢাকায় থাকি- শুক্র, শনি আর রবিবার। সোমবার সকালে বাসে
করে সিরাজগঞ্জে যাই। সেখানের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের
নিউরোসার্জারীর ডাক্তার হিসেবে আমি কাজ করছি।
আগামীকাল সকালে সিরাজগঞ্জে যাবো। তাই এস আই বাস কাউন্টারে সকাল থেকে ফোন
করছিলাম। কিন্তু মোবাইল বন্ধ পাচ্ছি। পরে দুপুরের দিকে জানলাম, বিরোধী দলের ‘ঢাকা
চলো’ –র জন্য ঢাকা থেকে কোনো বাস সিরাজগঞ্জে যাচ্ছে না। হাসপাতালের অফিসে ফোন করে
জানলাম, হাসপাতালের একটি গাড়ি রাত ১০ টার দিকে ঢাকা থেকে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে
ছাড়বে। সেটায় কোনোরকমে একটা জায়গা ঠিক করলাম।
কিন্তু চিন্তা করছি- দেশ কোন দিকে এগোচ্ছে? আজ সারাদিন চারবারের মতো
লোডশেডিং হয়েছে, এখনো সন্ধ্যাই নামেনি! রাস্তায় গাড়ি চলাচল কমে গেছে। সন্ধ্যার
মধ্যেই রাজধানী শহর ভুতুড়ে শহরে পরিণত হবে বলে আশা করছি!
আমরা এইসব দেখতে চাই না। আমরা একটি সুখী সমৃদ্ধ, শক্তিশালী দেশ চাই, যেখানে
জাতীয় সম্পদের অপচয় হবে না, সময়ের মূল্য দেওয়া হবে, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে
পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা থাকবে, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন