বুধবার, ৭ মার্চ, ২০১২

আমার যতো কথা


(এই লেখাটা উন্মোচনের জন্য লেখা)

আমি এখানে নতুন। বেশ কিছুদিন আগে নিক খুললেও লেখা হয় নি। কি লিখবো, কি লিখবো করে বেশ সময় পেরিয়ে গেলো। পরে স্থির হলাম, টুকটাক কথামালা দিয়েই  শুরু হোক আমার উন্মোচন।


(১)          
আমি একজন ডাক্তার, নিউরোসার্জারীতে আছি অনেকদিন। রোগী দিয়েই শুরু করি আমার কথকতা।

হাসিব। ঢাকার একটি বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছিলো। বয়স হয়তোবা বাইশ কিংবা তেইশ। এই বয়সে তার মাথায় টিউমার হয়েছে। ক্যান্সার জাতীয়। আমাদের হাসপাতালে কয়েকদিন ভর্তি ছিলো। আমরা অপারেশন করেছিলাম, টিউমারের জন্য নয়। যে কয়দিন বেঁচে থাকবে, যাতে ভালোভাবে বেঁচে থাকতে পারে, সেই জন্য। অপারেশনের নাম Insertion of V-P shunt। গত সপ্তাহে ছুটি দিয়েছিলাম। আজ হাসিবের বাবা ফোন করেছেন। অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। তিনি অপেক্ষা করছেন কবে আল্লাহ হাসিবকে নিয়ে যাবেন। আমরাও অপেক্ষা করছি!

মাঝে মাঝে ভাবি, ডাক্তার হয়ে কি মানবিক বোধগুলো নষ্ট হয়ে গেছে? নিজের কাছে এর উত্তর পাই না।

(২)
আমি এক সময় খুব খেলা পাগল ছিলাম। আমার মনে আছে ছোট বেলায় আবাহনী- মোহামেডানের খেলা হলে দুই তিনদিন  আগে থেকেই কী উত্তেজনায় সময় কাটতো! আমি ছিলাম আবাহনীর সমর্থক। কোনো খেলাতে আবাহনী পয়েন্ট হারালে আমার কষ্টে নাওয়া খাওয়া হতো না। জিতলে তো কথাই নেই। আবাহনীর খেলার দিন বাসায় আবাহনীর পতাকা উড়াতাম। সারা শহর পতাকাময় হয়ে যেতো। বন্ধুদের সাথে চলতো কথার যুদ্ধ।

আজ বিজেএমসির বিরুদ্ধে আবাহনী বাংলাদেশ ফুটবল লীগে ১-০ গোলে জিতেছে। কেনো জানি না, আমার মনে সেটা কোনো রেখাপাত করেনি। এটা কি বয়স বেড়ে যাবার দোষ? না কি বর্তমান অবস্থার প্রভাব?
আমি ভাবছি, আমার কি মানবিক বোধগুলো নষ্ট হয়ে গেছে? নিজের কাছে এর উত্তর পাই না।

(৩)
একুশের বইমেলায় এবার আমরা বারোজন ব্লগার মিলে একটি বারোয়ারী উপন্যাস প্রকাশ করেছি। উপন্যাসটি লেখা হয়েছিলো একটি ব্লগে- নিয়মিতভাবে। লেখা শেষে বাংলাদেশের খুব নামকরা একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে এটি বের হয়েছে। জীবনের প্রথম প্রকাশিত বই, হোক সেটা বারোয়ারী। অনেক বাধভাঙ্গা আবেগ থাকা উচিৎ, তাই না? কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, বইটি যখন হাতে পেলাম, খুব একটি বিহ্বল হয়ে উঠিনি, আবেগের আতিশয্যে চোখ অশ্রুসজল হয় নি।

অবাক হয়ে ভাবতে লাগলাম, আমার কি মানবিক বোধগুলো নষ্ট হয়ে গেছে? নিজের কাছে এর উত্তর পাই না।

(৪)
রোগী দিয়ে শুরু করেছিলাম, রোগী দিয়েই শেষ করি।

দুইদিন আগে একটি তিন বছরের বাচ্চার অপারেশন করেছিলাম। এক্সিডেন্ট করে প্রায় মৃতবৎ অবস্থায় হাসপাতালে এসেছিলো। আমরা বাঁচানোর আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম। তারপরও শেষ চেষ্টা হিসেবে অপারেশনটা করা হয়। অপারেশনের পরদিনই আমি ছুটিতে চলে আসি। আজ হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছে। বাচ্চাটির জ্ঞান ফিরেছে। এমন কি কথাও বলতে পারছে।

মনটা এক অনাবিল আনন্দে ভরে উঠলো। নতুন করে আবার ভাবতে লাগলাম, আমার বোধহয় মানবিক বোধগুলো নষ্ট হয়ে যায় নি। আমি বোধহয় এখনো মানুষ আছি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন