বুধবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১২

বিশ্বের প্রথম গ্লামারাস অভিনেতার প্রতি তার জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি


()

এই বর্তমান যুগে এসে কেউ নির্বাক ছবি পছন্দ করবে, তাও আবার সাদাকালো- চিন্তাও করা যায় না। কিন্তু  The Artist  শুধু দর্শক নন্দিতই হয় নি, এবারের অস্কারের সেরা ছবির পুরস্কারও পর্যন্ত পেয়ে গেছে। ছবিটি আমার এখনো দেখা হয়নি, তবে সংগ্রহ করে রেখেছি। সময় সুযোগমতো দেখে নিবো।

নির্বাক ছবি দেখার অভিজ্ঞতা আমার আছে। এর আগে আলফ্রেড হিচককের নির্বাক The Farmers Wife দেখে মনেই হয়নি যে আমি কোনো নির্বাক ছবি দেখছি। গ্রিফিথের মাস্টারপীচ ১৯১৬ সালের  Intolerance দেখে নির্বাক ছবি সম্পর্কে আমার ধারনাটাই পরিবর্তন হয়ে যায়। এরপর গ্রিফিথের আরেকটি মাস্টারপীচ ১৯১৫ সালে তৈরী আমেরিকার স্বাধীনতা নিয়ে Birth of a Nation- মুগ্ধ হয়ে দেখেছি।

                                        স্যার চার্লস স্পেন্সর চ্যাপলিন

কিন্তু Intolerance বা  Birth of a Nation- হচ্ছে সিরিয়াস ধরনের চলচ্চিত্র। Silent era বা নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রের কথা বললেই সবার আগে যে ব্যক্তিটির চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠে, সে আর কেউ নয়- চার্লি চ্যাপলিন।


সহজ সরল একটা মানুষ, শরীরে ঢিলেঢালা ময়লা প্যান্ট আর জীর্ণ কালো কোট, পায়ে মাপহীন জুতো, মাথায় কালো হ্যাট, হাতে লাঠি আর সেই বিখ্যাত কিম্ভুত কিমাকার গোঁফ। লোকটা রাস্তায় ঘুরছে ভবঘুরের মতো আর মজার মজার কান্ড ঘটাচ্ছে আর বিশ্বের মানুষদেরকে আমোদিত করছে। তিনি হচ্ছেন বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রবাদপ্রতিম পুরুষ স্যার চার্লস স্পেন্সর চ্যাপলিন। আজ সেই চার্লি চ্যাপলিনের জন্মদিন- ১৮৮৯ সালের ১৬ এপ্রিল এই প্রবাদপ্রতিম পুরুষ জন্মগ্রহন করেন।

()

গ্র্যান্ডভিল রেডমণ্ড। একজন বিখ্যাত ল্যান্ডস্কেপ আর্টিস্ট। তিনি ১৮৭১ সালের মার্চ ফিলাডেলফিয়াতে জন্মগ্রহন করেন। গ্রান্ডভিল জন্মথেকেই সম্পূর্ণ বধির ছিলেন। কেউ কেউ বলে থাকেন, গ্রান্ডভিলের বয়স যখন আড়াই বছর, তখন তিনি স্কারলেট  ফেভারে আক্রান্ত হোন এবং তখন থেকেই তিনি বধির। গ্রান্ডভিল বার্কলের California School for Deaf- থেকে গ্রাজুয়েট হবার পর কিছু কিছু নির্বাক চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন।

                                    গ্র্যান্ডভিলের সাথে চার্লি চ্যাপলিন

১৮৯৪ সালে গ্রান্ডভিলের সাথে চার্লি চ্যাপলিনের পরিচয় ঘটে এবং চার্লি গ্রান্ডভিলের আর্টের খুব বড় একজন ভক্ত হয়ে উঠে। তাদের মধ্যে গড়ে উঠে চমৎকার বন্ধুত্ব। চার্লি গ্র্যান্ডভিলের কাছ থেকেই Sign language এবং  Finger spelling  শিখে। নির্বাক ছবির অন্যতম ডিরেক্টর অ্যালবার্ট ব্যালিন্স চার্লি চ্যাপলিনের এই অসাধারণ মূকাভিনয়ের জন্য গ্র্যান্ডভিলকেই কৃতিত্ব দিয়ে থাকেন। চার্লি তার নির্বাক চলচ্চিত্রগুলোতে কখনোই ঠোট ব্যবহার করেন নি, বরঞ্চ তিনি Gesture এবং এমন সব Expressions  ব্যবহার করেছেন, যেগুলো বধিরেরাই ব্যবহার করে। গ্র্যান্ডভিল পরবর্তীতে চার্লি চ্যাপলিনের “The Dog’s Life”, “The Gold Rush” সহ বেশকিছু ছবিতে অভিনয় করেন।

()

নির্বাক চলচ্চিত্রের একচ্ছত্র  সম্রাট হিসেবে চার্লি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছেন, তখনই নির্মান শুরু হয় সবাক চলচ্চিত্রের। মানুষের মনোভাব বুঝে সবাক ছবি তৈরী হবার ১৩ বছর পর নির্মান করলেন তার প্রথম সবাক- “The Great Dictator এই চলচ্চিত্রে তিনি নাৎসীজম এবং ফ্যাসিবাদ নিয়ে সরাসরি বিরোধিতা করেন এমন এক সময়ে যার এক বছর পর আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহন করে। যদিও হিটলার চার্লি চ্যাপলিনের খুব গুণমুগ্ধ ছিলেন এবং বয়সে চার্লি থেকে মাত্র  চার দিনের ছোট ছিলেন।

                                  The Great Dictator-এ চার্লি চ্যাপলিন


এই চলচ্চিত্রটি টি বিষয়ে অস্কারে মনোনয়ন পায়, যার মধ্যে ছিলো শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হিসেবে চার্লি চ্যাপলিনের মনোনয়ন।

()

McCarthyism  যুগের সময় চ্যাপলিনকে কমুনিষ্ট ভাবাপন্ন হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। সম্প্রতি ২০১২ সালে প্রকাশিত গোপন নথিতে দেখা গিয়েছে, FBI ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের কাছে চ্যাপলিন  সম্পর্কিত এমন কিছু তথ্য চেয়েছে যার ফলে তারা তাঁকে আমেরিকা থেকে বহিস্কার করতে পারে, যেমন, FBI জানতে চেয়েছিলো চার্লির প্রকৃত জন্মস্থান কোথায় এবং তার আসল নাম ইসরেল থর্নস্টেন কি না!

১৯৫২ সালে যখন চার্লি তার Limelight  চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ারের জন্য লন্ডনে আসেন, তখন জে এডগার হুভার আমেরিকান ইমিগ্রাশন বিভাগকে বলেছিলেন কীভাবে চ্যাপলিনের আমেরিকা প্রবেশ আটকানো যায়। চ্যাপলিনও আর আমেরিকায় না- আসার সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি বললেন,  "Since the end of the last world war, I have been the object of lies and propaganda by powerful reactionary groups who, by their influence and by the aid of America's yellow press, have created an unhealthy atmosphere in which liberal-minded individuals can be singled out and persecuted. Under these conditions I find it virtually impossible to continue my motion-picture work, and I have therefore given up my residence in the United States."

১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য স্ত্রীসহ বিজয়ীর বেশে আবার আমেরিকায় আসেন চ্যাপলিন, সেবারের অস্কারে বিশেষ সম্মাননা পুরস্কার নেবার জন্য।

()

এবার চ্যাপলিনকে নিয়ে কিছু মজার কাহিনী

চার্লি চ্যাপলিন তখন বিশ্বখ্যাত। একবার তাঁর অনুকরণে অভিনয়ের একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। চ্যাপলিন চুপিচুপি সেই প্রতিযোগিতায় নিজের নাম লেখালেন। যথাসময়ে প্রতিযোগিতা শুরু হলো। ফলাফলও ঘোষণা হলো। দেখা গেল, খোদ চার্লি চ্যাপলিন তৃতীয় স্থান অর্জন করেছেন!

এক বারো বছর বয়সী ছেলে স্টেজে উঠে অসাধারণ অভিনয় করল। দর্শক সারিতে ছিলেন বিশ্বখ্যাত লেখক স্যার আর্থার কোনান ডয়েল। তিনি বালকটির অভিনয় দেখে মুগ্ধ। ছেলেটিকে কাছে ডেকে বললেন, তুমি লেগে থাকো। তোমার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল" ছেলেটি বলল, আমি খুব গরিব।  আজ এই মুহূর্তে আপনার এক বছরের উপার্জন আমাকে দিলে আগামী পাঁচ বছরে আমার উপার্জন  আপনাকে দিয়ে দিতে রাজি আছি  শুনে কোনান ডয়েল বেশ বিরক্ত হলেন। কিছু বললেন না।
পরে ছেলেটি আমেরিকা চলে যায়।  এক বছর পর দেখা গেল তার উপার্জন কোনান ডয়েলের উপার্জনকে ছাড়িয়ে গেছে। ছেলেটি আর কেউ নয়, চার্লি চ্যাপলিন।

চার্লি চ্যাপলিনের জন্মদিন। উপলক্ষে পার্টির ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনি সবাইকে বিখ্যাত ব্যক্তিদের অনুকরণ করে দেখালেন। গানও গাইলেন। গান শেষে একজন জিজ্ঞেস করল, আপনি গান শিখলেন কার কাছে?”  “কারো কাছ থেকে শিখিনি"
কিন্তু এইমাত্র যে গাইলেন!
বিখ্যাত এক গায়ককে অনুকরণ করলাম মাত্র”,  হেসে জবাব দেন চার্লি চ্যাপলিন।

                        বোনাস ছবি- ১৯৩১ সালে মহাত্মা গান্ধীর সাথে চ্যাপলিন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন