আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। আমার জন্মই হয় নি তখন। কিন্তু আমার বাবা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর কাছে শুনেছিলাম কী আবেগ নিয়ে সাড়ে সাত কোটি মানুষ একাত্ম হয়েছিলেন দেশ মাতৃকাকে হানাদার বাহিনীর শিকল থেকে মুক্ত করতে। তাঁর কাছে আরও শুনেছিলাম কিছু অমানুষ, হায়েনাই শুধু স্বাধীনতাঁর বিরোধী ছিলো এবং সেই সব কুলাঙ্গার মীর জাফরদের জন্য আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের সেরা সন্তানদের। আমি আমার বাবার কথা শুনে অবাক হয়েছি, আবার হেসেছি। তখন যে দেশের ক্ষমতায় স্বৈরাচার এরশাদ! বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম- কিছু বুঝতে পারার পর থেকেই দেখছি স্বৈরতন্ত্র, দেখছি মুক্তিযোদ্ধারা অবহেলিত, দেখছি রাজাকাররা পুনর্বাসিত, শুনেছি রাজাকার শাহ আজিজুর রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়া। বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম- তোমরা কি আমাদেরকে এই সব দেবার জন্য স্বাধীনতা এনেছিলে? প্রশ্ন করেছিলাম, ৭১ এ তোমরা কীভাবে সবাই এক সত্ত্বায় মিশে গিয়েছিলে? আমার মুক্তিযোদ্ধা বাবা কোন উত্তর দিতে পারে নি, নিশ্চল নিশ্চুপ ছিলো। তাঁর চেহারায় সেদিন দেখেছিলাম প্রচন্ড লজ্জা, হতাশা, ক্ষোভ।
৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী গণ আন্দোলনে আমি ঢাকায় ছিলাম না। তখন খুব একটা বড়ও ছিলাম না। পঞ্চম শ্রেনীর ছাত্র আমি তখন। নভেম্বর থেকে আন্দোলনের আঁচ কিছুটা টের পেতাম, কিছুটা বুঝতে পারতাম। বাবার কাছে থেকে প্রতিদিনের আপডেট শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। মনে আছে ৬ই ডিসেম্বর স্বৈরাচারের পতনের পর ছোট্ট মৌলভীবাজার শহরে চিৎকার করে বেড়িয়েছিলাম- "হৈ হৈ রৈ রৈ, এরশাদ চোরা গেলো কৈ?" কিন্তু তখনো গণ জাগরণের মূল উত্তাপটা ঢাকায় না থাকাতে আর ছোট হওয়াতে অতটা বুঝতে পারে নি। কিন্তু নতুন সূর্য উঠার দিন যে সামনে আসতে যাচ্ছে- সেটা বুঝতে পারছিলাম।
খুব দ্রুতই আশাভঙ্গ হলো, যখন একদিন বাবা অফিস থেকে এসে প্রচন্ড হতাশ কন্ঠে জানালেন, রাজাকার আব্দুর রহমান বিশ্বাস প্রেসিডেন্ট হয়েছে। রাজাকারদের দল, হায়েনাদের দল জামাতে ইসলামী ক্ষমতার জোটে আছে। রাজাকার, যুদ্ধপরাধীদের বিচার হবে না! তাই ৯৬-এ আমি যখন এস এস সি পরিক্ষার্থী, মনে আছে পড়াশোনা বাদ দিয়ে "নৌকা, নৌকা" বলে চিৎকার করেছি- আওয়ামী লীগ সাপোর্ট করার জন্য নয়, ভেবেছিলাম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে দেশ রাজাকারমুক্ত হবে। বিধাতা মুচকি হেসেছিলেন! আমরা একই মুদ্রার এপিঠ- ওপিঠ দেখলাম। জনগনকে তারা বোকা ভেবেছিলো, কিন্তু জনগন বোকা নয়। আওয়ামী লীগের জায়গায় এলো আবার বিএনপি।
কিন্তু বিএনপি খেললো চরম খেলা। রাজাকাররা জাতীয় পতাকা গাড়িতে লাগিয়ে চোখের সামনে ঘুরতে লাগলো। ততদিনে আমি এবং আমরাও অনেক বড় হয়ে উঠেছি- আসল ইতিহাস জানতে শুরু করেছি। তরুন প্রজন্মের ভিতর রাজাকার, যুদ্ধপরাধী আর জামাত শিবির বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠেছে। কিন্তু তখনো কোনো স্বতঃস্ফুর্ত গণ জাগরণ দেখেনি। শুধু ৭১ এর একাত্ম হওয়ার ব্যাপারটি তখনো রুপকথার মতোই মনে হতে লাগলো। ভেবেছিলাম এই জনমে আর একাত্ম বাংলাদেশ দেখতে পাবো না। বিধাতা আবারো মুচকি হাসলেন।
আজ ৮ই ফেব্রুয়ারী, ২০১৩ সাল।
আজ বাবাকে করা একটি প্রশ্নের উত্তর পেয়েছি। কীভাবে তাঁরা ৭১ এ একাত্ব হয়েছিলো। আজ গন জাগরণ কাকে বলে- নিজে বুঝেছি, এর উত্তাপ গায়ে মেখেছি। আজ হারিয়ে গিয়েছি নতুন আবিষ্কারের নেশায়, উল্লাসিত হয়েছি অসম্ভব সুন্দর বাংলাদেশের অসম্ভব দেশ প্রেমিক জনগণকে দেখে, আপ্লুত হয়েছি দেশ জোড়া বন্ধু দেখে, বিহবল হয়েছি দেশের বাইরে থাকা দেশপ্রেমিকদের দেশ নিয়ে ভাবনা দেখে।
কি বললেন? আপনি দেখেন নি? সময় আছে এখনো, চলে আসুন শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে, স্বাক্ষী হোন এক অসাধারণ ইতিহাসের। আর অবশ্যই বজ্র কন্ঠে বলে উঠুন, "কাদের মোল্লা, নিজামী, গো আ, মুজাহিদ, সাকা, বাচ্চুসহ সকল যুদ্ধপরাধীদের ফাঁসি চাই, জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই, জামাত শিবির নিয়ন্ত্রিত সকল ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান বর্জন চাই।"
আসুন আপনি প্রজন্ম চত্বরে, আপনার অপেক্ষাতেই আমরা আছি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন