রাত ১ টা বাজে । মোবাইলের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে গেল । রতন ভাইয়া, আমার খুব ঘনিষ্ঠ প্রিয় মানুষ, ফোন করেছে । তার বাবার ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছে । আমি আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে বললাম, খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারীতে । তাদের আসতে আসতে রাত ৪ টা বেজে গেলো । ব্রেইনে বিশাল বড় একটা রক্তক্ষরন হয়েছে । বেচেঁ থাকার সম্ভাবনা খুবই কম । ভর্তি করে লাইফ সাপোর্ট দিতে দিতে পুব আকাশে সূর্য উঠে গেলো ।
সকালে একটা ব্রেইন টিউমার রোগীর রুটিন অপারেশন ছিল- ৩৫ বছরের এক তরতাজা যুবক । ছোট্ট একটা ছেলে আছে, জমি বিক্রি করে অপারেশন করতে এসেছে । জটিল অপারেশন । টিউমারের জন্য চোখে দেখতে পারছে না, অপারেশন সফল হলে হয়তোবা, হয়তোবা সে দেখতে পারবে। প্রায় ৭ ঘন্টা ধরে অপারেশন চলল, আমরা তাকে পরিপূর্ণ সজাগ করলাম না। এদিকে প্রায় বিকাল ৪ টা, দুপুরের খাবার খেতে বসবো, ইমার্জেন্সী কল আসলো ।
১৫ বছরের এক ছেলে, নসিমনের (দেশের উত্তরাঞ্চলে ব্যবহৃত এক বিশেষ ধরনের যান) সাথে ধাক্কা লেগে অজ্ঞান হয়ে হাসপাতালে এসেছে । সিটি স্ক্যান করে দেখা গেলো এপিডুরাল হেমোরেজ (ব্রেইনের সবচেয়ে উপরের কভারে রক্তপাত, যা দ্রুত অপারেশন করলে রোগী সুস্থ হয়ে যায়) । শরীরে রাত জাগরনের ছাপ, টানা ৭ ঘন্টা ধরে অপারেশন করার ক্লান্তি, অন্যদিকে রোগীর জীবন ।
আবারও অপারেশন থিয়েটারে, আবারও ২ ঘন্টা ধরে অপারেশন । কিন্তু চোখে-মুখে সাফল্যের পরিতৃপ্তি, ছেলেটার যে জ্ঞান ফিরে এসেছে, সে যে কথা বলতে পারছে । ব্রেইন টিউমারের রোগীও সম্পূর্ণ সজাগ হয়েছে এবং সে চোখেও একটু একটু দেখতে পারছে । মন টা অনাবিল আনন্দে ভরে উঠলো ।
মানসিক প্রশান্তি নিয়ে ক্লান্ত শরীরে যখন বাসার দিকে রওয়ানা দিবো, ঠিক তখনিই রতন ভাইয়ার বাবা খারাপ হয়ে গেলো । বাসায় আর যাওয়া হলো না । অনেকক্ষন চেষ্টা করার পর রাত ২ টার দিকে উনি এই নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছেড়ে অন্যভুবনে চলে গেলেন । সব কিছু ঠিক করে বাসায় ফিরতে ফিরতে আবারো সকাল হয়ে গেলো ।
৪৮ ঘন্টার ক্লান্তিতে বিছানাকে খুব আপন মনে হলো ।
দুপুরে ঘুম ভাঙ্গলো সহধর্মিনীর ফোনে- খাওয়া দাওয়া ঠিকমতো হয়েছে কিনা । মুখে খাবার দিয়েছি কি দিই নি, ঢাকা থেকে আমার ছোট বোনের ফোন—“ভাইয়া, আব্বু আর নেই, অফিসে সিড়িতে পড়ে গিয়ে মাথায় রক্তপাত হয়ে হাসপাতালে নেবার আগেই মারা গেছেন”—ওর কান্নায় আর কিছু শুনতে পারছিলাম না, আমার কান্নায় চোখে কিছু দেখতে পারছিলাম না ।
আমি যখন ঢাকার পথে, রতন ভাইয়া ফোন দিল উনার বাবার দাফন হয়ে গেছে জানাবার জন্য, আমি উনাকে জানালাম আমি ঢাকায় যাচ্ছি আমার বাবাকে দাফন দেবার জন্য। ফোনের দুই প্রান্তেই অনেকক্ষন ধরে কোনো শব্দ নেই, শুধু ফোপানোর আওয়াজ ছাড়া ।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন