সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। হাসপাতালে আসার কিছুক্ষনের মধ্যেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হলো। শহুরে জীবনে এখন আর বৃষ্টির রিমঝিম নুপুর কানে বাজে না, জানালা দিয়ে বারিপাত দেখতে দেখতে কখন যে অতীতে চলে গিয়েছিলাম, সম্বিত ফিরে পেলাম বন্ধুবর নাজমুলের ফোনে। মোবাইল ফোনকে অবশ্য আমরা এখন মুঠোফোন বলে ডাকতে শুরু করেছি। সেই মুঠোফোনেই সে আমাকে রীতিমত কোনঠাসা করে ফেললো।
আমাকে নাকি দিনের বেশীরভাগ সময় বক্কর বক্কর ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। রোগী দেখি কি না সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিহান। অনেক কষ্ট হলো বোঝাতে, আমি প্রতিদিন সকাল বেলা হাসপাতালে এসেই আমার রুমে ল্যাপটপ খুলে আন্তর্জালের সাথে সংযুক্ত হই, যখন রোগী থাকেনা বা চাপ কম থাকে, তখন নিজেও বক্কর বক্কর লিখি, অন্যেরটাও পড়ি।
আজ রোগীর চাপ অনেক কম, হয়তোবা বৃষ্টির দিন বলেই। মুষলধারে বৃষ্টি দেখে মনে পড়ে গেলো লিবিয়াতে কখনো এরকম বৃষ্টি দেখিনি। ঝড়ো লু হাওয়া নতুবা সকাল বেলার ঈলশে বৃষ্টি। লিবিয়ার একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেলো। আমরা ছিলাম গারিয়ানে, পাহাড়ী এলাকা, ঠিক যেন আমাদের রাঙ্গামাটি। আবহাওয়া খুব চমৎকার ছিল, না গরম না ঠান্ডা। যাবার কিছুদিনের মধ্যে জানতে পারলাম, লিবিয়া IBM নীতির উপর দাঁড়িয়ে আছে। আপনি কোনো কাজ ২-৩ দিনের মধ্যে করতে চাইলে কেউ যদি আপনাকে বলে-ইনশাআল্লাহ (I), তাহলে কাজটি ১ সপ্তাহের মধ্যে হতে পারে, যদি বলে –বোখরা (আগামীকাল) বা বাদ বোখরা(আগামী পরশু)(B), তাহলে কাজটি ছয় মাসের মধ্যে হলেও হতে পারে, আর যদি বলে মা’জা(অপেক্ষা করো)(M), তাহলে কাজটি আদৌ হবে কি না বলতে পারবেন না। আমার ভাগ্য ভালো লিবিয়াতে বিদ্রোহ শুরু হবার সাত মাস আগেই দেশে চলে আসি।
সকালের পত্রিকাতে চোখ বোলাচ্ছিলাম। প্রথম পাতায় বড় করে ছাপানো-সুপ্রীম কোর্টের আপীল বিভাগ সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈ্ধ ঘোষনা করেছে, তবে জনস্বার্থে পরবর্তী দুইটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টার পদে সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের পরিহার করাই ভালো এমন অভিমত ব্যক্ত করা হয়েছে যাতে বিচার বিভাগ দলীয়করনের ঊর্ধ্বে থাকে। আমি কিছুদিন আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার সম্পর্কে একটি লেখা লিখেছিলাম, সেখানে এরকম কিছু পরামর্শও দিয়েছিলাম।
সিস্টারের ডাকে ল্যাপটপ থেকে চোখ সরালাম, জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালাম। এক রোগীর আজ ছুটি হবে, ছুটির কাগজে স্বাক্ষর লাগবে। সাত বছরের বাচ্চা ছেলে সাইমন। দশদিন আগে রাত নয়টা্র দিকে ইমার্জেন্সীতে আসে রক্তাক্ত অবস্থায়। সিএনজির ধাক্কায় অজ্ঞান হয়ে ছিলো। মাথার খুলি একজায়গায় দেবে গিয়ে ব্রেনকে চাপ দিচ্ছিলো। সাইমনের মা বার বার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন, বাবা দৌড়াদৌড়ি করছিলেন তার ছেলেকে বাঁচানোর জন্য। দ্রুত সেদিন রাতেই অপারেশন করা হলো। আজ সেই সাইমনের ছুটি।
আমার রুম থেকেই দেখতে পাচ্ছি, সিস্টার সাইমনের বাবা-মাকে ছুটির কাগজ বুঝিয়ে দিচ্ছে। মা বার বার ছেলের মাথায় সেলাই করার জায়গায় হাত দিয়ে দেখতে চাচ্ছে সবকিছু ঠিক আছে কি না, সাইমন প্রতিবারই হাত সরিয়ে দিয়ে একটু বিরক্ত হয়েই বলছে, “দুক পাই তো”। হেসে ফেলি আমি। জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখি বৃষ্টি এখনো পড়ছে, তবে মুষলধারে নয়, থেমে থেমে।
লিবিয়ার ভাষা গুলো জেনে ভাল লাগল.............
উত্তরমুছুনআর আপনার ডা. লাইফের গল্পগুলো শুনতে ভালই লাগছে...............আশা করি আরত্ত লিখা পাব।
আর লিবিয়া নিয়ে মজা কোন স্মৃতি শুনার অপেক্ষায় রইলাম।
আল্লাহ রহমত.......আপনি আগে চলে এসেছেন।
লিবিয়া নিয়ে লেখার ইচ্ছা আছে। ভালো লাগলো তোমার মন্তব্য পড়ে।
উত্তরমুছুন