(এই লেখাটা চতুর্মাত্রিকে রোবোটের লেখা “ব্লগে কি দেখতে চাইনা, কি পড়তে চাইনা - ১ম টুকরা”--এর পরিপ্রেক্ষিতে লেখা)
কিছুক্ষন আগে রোবোটের লেখা “ব্লগে কি দেখতে চাইনা, কি পড়তে চাইনা - ১ম টুকরা”-লেখাটা পড়ে মন্তব্য লিখতে গিয়ে দেখলাম বিশাল বড় হয়ে যাচ্ছে, তাই ভাবলাম পোষ্ট আকারেই লিখি। প্রথমেই বলে নিই, আপনার পোষ্ট পড়ে ভালো লেগেছে।
আমি একজন ডাক্তার মানুষ (মানুষ শব্দটার প্রতি জোড় দিচ্ছি বেশী)। স্কুল - কলেজ লাইফে টুকটাক লেখালেখি করতাম (কলেজ ম্যাগা্জিন গুলোতে), কিন্তু মেডিকেলে ভর্তি হবার পর সময়াভাবে একেবারে চুপসে যাই। সত্যি কথা বলতে গেলে ব্লগিং শব্দটার সাথে আমার পরিচয় খুব কম দিনের।
বিভিন্নভাবে রোগীদের সাথে interaction-এর ঘটনাগুলো আমাকে খুব ভাবাতো, ভাবতাম এগুলো লিখে রাখি। আমাদের দেশে এমনিতেই ডাক্তারদের সম্পর্কে অনেক নেতীবাচক কথা বা ধারণা প্রচলিত আছে। আমি চেয়েছিলাম একজন ডাক্তারের চোখ দিয়ে রোগীদের সম্পর্কে আমরা কি ভাবি তা মানুষকে জানাতে। ডাক্তাররাও যে মানুষ, তাদেরও যে হৃদয় আছে, তা ফুটিয়ে তুলতে।তখনই আমার এক বন্ধু আমাকে ব্লগ লেখার পরামর্শ দিল।
সে আমাকে শুধুমাত্র মুক্তব্লগের কথা বলল, মজার ব্যপার হচ্ছে আমি তখন অন্য কোনো ব্লগের নামই জানতাম না। সেই মুক্তব্লগেই একজন ব্লগারের একটি পোষ্ট পড়ে অনেকগুলো বাংলা ব্লগের নাম জানতে পারি। এক অবসর মুহূর্তে প্রায় সবগুলোতে চোখ বোলাতে লাগলাম।
ব্লগ ওয়েবসাইটগুলোর সমালোচনা আমি করবো না, এই ব্যপারে আমি একেবারেই নবীন।শুধু এটুকু বলতে পারি (আমি যতদূর পড়েছি, সে থেকেই বলা), পোষ্টের চাইতে পোষ্ট সম্পর্কে মন্তব্যগুলোই বেশী আপত্তিকর থাকে। অধিকাংশ কথা-বার্তাই পোষ্টের মূল বিষয় থেকে দূরে সরে যায়। আবেগের চাইতে যুক্তি থাকে কম, গঠনমূলক সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতা তার চেয়েও কম।
আমি একবার এক প্রখ্যাত ব্লগারের এক রাজনৈ্তিক লেখার একটা সমালোচনামূলক লেখা লিখেছিলাম, জবাবে সে মুল বিষয়বস্তুর ধারে কাছে না গিয়ে বাংলাদেশের সকল ডাক্তারদের তুলোধুনো করে ফেলেছিলেন (যেহেতু আমি একজন ডাক্তার), শেষে লিখেছিলেন- তিনি আর সেই ব্লগে ঢুকবেন না বা লিখবেন না। ক’দিন পরেই আমি আবার তার নিক দেখতে পেয়েছিলাম।
একটা মজার ব্যাপার বলি, যে পোষ্টের জন্য (ব্লগে কি দেখতে চাইনা, কি পড়তে চাইনা - ১ম টুকরা) আমার এই লেখা, সেখানে রোবোট বলেছেন, ব্লগে তিনি গালি-গালাজ দেখতে চান না। পোষ্টটার মন্তব্যগুলোতে একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সহমত জানাতে গিয়ে কেউ কেউ সেই ব্যক্তিগত আক্রমনই করেছেন বা গালি-গালাজ দিয়েছেন। সত্যিই সেলুকাস! কি বিচিত্র এ ব্লগ জীবন!
তারপরও ব্লগ ভালো লাগে, খুব ভালো লাগে। আমি চতুরে ব্লগ লেখা শুরু করার পর থেকে ব্লগারদের কাছ থেকে যেরকম উৎসাহমূলক মন্তব্য পেয়েছি, তা আমার লেখার গতিকে আরো সচল করেছে। এক লেখার মন্তব্যে নুশেরা লিখেছিলেন, “জন্মমৃত্যুর মতো দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা চিকিৎসকরা খুব কাছ থেকে এবং খুব বেশি সংখ্যায় দেখেন। তবু অ্যাপ্রনের আড়ালে ডাক্তারও একজন ব্যক্তিমানুষ”। ভালো লেগেছিলো মানুষ হিসেবে স্বীকৃ্তি পাওয়ায়। একবার নাজমুল হুদা লিখেছিলেন, “আমার ৪ বছর বয়সের নাতনীকে নিয়ে ডাক্তারের চেম্বারে যেয়ে জানতে পারলাম যে ডাক্তার অসুস্থ, রোগী দেখবেন না। ফিরবার পথে আমার নাতনীর বিস্মিত মুখে প্রশ্ন ‘নানা, ডাক্তারদেরও অসুখ হয়?’” খুব মজা পেয়েছিলাম নাতনীর বিস্মিত প্রশ্ন পড়ে।আবার তিনিই (নাজমুল হুদা) খুব সুন্দরভাবে আমাকে দায়িত্ব সচেতন করেছেন, “ডাক্তার, আপনার লেখার হাত বেশ ভালো। আশা করি পেশার প্রতিও আপনি এমনই যত্নবান এবং আন্তরিক”। যেমন মামুন হক লিখেছেন, “যদিও আপনার লেখাগুলো পড়ে আমিও খুব কষ্ট পাই তবুও মানুষের জন্য আপনার এই অসীম দায়বদ্ধতা আর মমতা আসলেই মন ছুঁয়ে যায়”- রোগীদের প্রতি দায়বদ্ধতা আর মমতা আমার আরো বেড়ে যায়। এমনিভাবে আরো অনেকের মন্তব্যে আমি আরো বেশী করে উদ্দীপ্ত হয়েছি-পেশাগত কাজে, লেখনীর ধারে।সবার কাছে আমি ভীষন কৃতজ্ঞ।
আমার কাছে ব্লগের উদ্দেশ্যই তাই। আমার ভালোলাগা আমি জানাবো, অপছন্দটা যুক্তিসহকারে বোঝাবো, অন্যদের কাছ থেকে জানবো, শিখবো, আমি যা জানি তা অন্যকে জানাবো—খুব সুন্দর একটা মিথস্ক্রীয়া।
ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া হয়ে গেলো। আমি লিখতে বসেছিলাম রোবোটের পোষ্টের সাথে সহমত হয়ে, অথচ নিজের কাহিনী শোনাচ্ছি। রোবোট, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ খুব সুন্দর এবং সময়োপযোগী একটা লেখার জন্য। অপেক্ষায় রইলাম পরবর্তী টুকরোর জন্য।
সবশেষে কেউ যদি কোনো ভাবে আমার কোনো লেখায় কষ্ট বা দুঃখ পেয়ে থাকেন, আমি আন্তরিকভাবে তার কাছে দুঃখিত।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন