রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৩

বাবা দিবসে বাবাকে নিয়ে লেখা

বাবার সাথে আমার সম্পর্কটা খুব অদ্ভুত কিসিমের ছিলো। জ্ঞান হবার পর থেকেই উনাকে দেখে এসেছি রাশভারী স্বভাবের, কদাচিৎ দেখেছি হাসি হাসি ভাবে আমাদের দুই ভাইবোনের সাথে কথা বলতে। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলো আমার সবচেয়ে ছোট বোনের ক্ষেত্রে। খুব ছোট ছিলো বলেই হয়তোবা বাবা (বাবাকে আমি সবসময় আব্বু ডাকতাম) নাবিলার কাছে ভয়ঙ্কর ছিলেন না!


আব্বুকে খুব ভয় পেতাম। কোন কিছু বলার সাহস পেতাম না। তাই আমাদের সব আবদার থাকতো আম্মুর কাছে। যখন কলেজে পড়তাম একবার কম্পিউটার কিনতে চাইলাম। সেটা অনেক আগের কথা। তখনো কম্পিউটার কেনার জন্য এতো দোকান ছিলো না। আম্মু আমাকে নিয়ে একজনের সাথে কথা বলে সব ঠিক করলেন, কিছু টাকা অগ্রীমও দিয়ে এলেন। কম্পিউটার একদিন পর বাসায় দিয়ে যাবে- এই বন্দোবস্ত হলো। রাতে খাবার টেবিলে আব্বু সব শুনলেন, সেই রাতেই আমি আর আম্মু গিয়ে সেই লোকটাকে ‘না’ করে দিয়ে আসলাম।

আরেকবার ক্লাস ফাইভের বৃত্তির টাকা দিয়ে সাইকেল কেনার জন্য গোঁ ধরলাম। বড় চাচা পর্যন্ত আমার বায়না চলে গেলো। অনেকটা চাচার কারণেই আব্বু আমাকে নিয়ে বংশালে গেলেন সাইকেল কেনার জন্য। অনেক ঘোরাঘুরি করে একটা সাইকেল পছন্দ হলো। যখন সাইকেলটি গাড়িতে তোলা হবে, আব্বু আমার দিকে তাকিয়ে হিমশীতল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “নিয়াজ, তুমি সাইকেল কিনবে?” আমি তাঁর কন্ঠস্বর শুনে সঙ্গে সঙ্গে সুবোধ বালকের মতো বললাম, ‘না’। সাইকেল আর আমার কেনা হলো না!

আব্বু ছিলেন বিচারক। মনে আছে, একবার এক বৃদ্ধ মহিলা সন্ধ্যার সময় আমাদের বাসায় এসে কোনো এক মামলায় তার ছেলের মুক্তির জন্য আমাদের সামনেই আব্বুকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে চাইলেন। আমি সেই টাকার বান্ডিলের দিকে তাকিয়ে ছিলাম- এতো টাকা জীবনে একসাথে দেখছিলাম প্রথমবার! আব্বু দারোয়ান ডেকে বৃদ্ধাকে সরিয়ে দিলেন। রাতে খাবার টেবিলে বললেন, ছেলেটি নির্দোষ, উনি বিকেলেই রায় লিখে এসেছেন। আমি শুনে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম, ‘তাহলে টাকাটা নিলেন না কেনো?’ উনি তাকিয়ে থেকে বললেন, “সেটা বোঝার বয়স তোমার হয় নি। আরেকটা কথা, তোমাদের কাছে অনেকেই অনেক মামলার ব্যাপার নিয়ে কথা বলতে আসবে, প্রলোভন দেখাবে। আমি যেনো কোনোদিন না শুনি তোমরা প্রলোভনে জড়িয়েছো”।

আব্বুর জীবনের শেষদিন পর্যন্ত চেষ্টা করেছিলাম তাঁর কথাটিকে মেনে চলতে।

আব্বুকে খুব ভয় পেতাম। বিচারক ছিলেন বলে তাঁর সাথে সহজে মিথ্যা কথা বলেও পার পেতাম না। বুঝে ফেলতেন কিছু একটা করেছি। যখন কলেজে পড়তাম, তখন নিজেকে সব বুঝদার ভাবতাম। মাঝে মাঝে আব্বুর কথায় মনটা বিদ্রোহী হয়ে উঠতো। ভাবতাম, আব্বু বোধহয় আমাদের ভালোবাসে না। আসলে উনি কখনো আমাদের ভাই বোনদের প্রতি ভালোবাসাটা প্রকাশও করতেন না। একবার, তখন আমি ডাক্তা, এপোলো হাসপাতালে চাকরী করি, আমাদের বাসা ফার্মগেট থেকে যানজটের কারণে খুব সময় লাগতো বলে বসুন্ধরার কাছে বাসা ভাড়া নিলাম। আব্বু না করেন নি। যেদিন আমি ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে আসছিলাম, বিদায় নেবার জন্য আব্বুর রুমে গিয়ে উনাকে পেলাম না। আমার রুমে গিয়ে দেখি, আমার ছবির দিকে উনি তাকিয়ে আছেন, আর চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। বুঝতে পারলাম, আমার আব্বুটাই এই রকম!

আম্মুকে হারিয়ে খুব আঘাত পেয়েছিলাম, কিন্তু মৃত্যুটা জানা ছিলো বলে মেনে নিতে পেরেছিলাম। কিন্তু আব্বুর চলে যাওয়াটা এতোই হঠাৎ ছিলো, কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলাম না। আব্বু চলে যাবার পরেই যেনো বুঝতে পারলাম, কতটা তাঁকে ভালোবাসি। নিজের সত্ত্বার সাথে কতটা বিশালভাবে উনি জড়িয়ে আছেন! আব্বু, তোমাকে খুব মিস করি, খুব ভালোবাসি।

‘বাবা দিবস’-এ আব্বুকে নিয়ে আগের দুটি লেখার লিঙ্ক দিলাম নিচে-

আদালতনামা
বিশেষ এক দিন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন