বুধবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০১২

সরলরেখা - বক্ররেখাঃ মলাটের আড়ালে



একটি গল্প। অসমাপ্ত গল্প। সরলরেখা - বক্ররেখা।

২০১১ সালের ১৯ আগস্ট চতুর্মাত্রিকব্লগের শ্রদ্ধাভাজন ব্লগার নাজমুল হুদা ভাইয়া একটি গল্প লিখলেন, তিন ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর এক বন্ধুর ছোট বোনকে নিয়ে, সরল রখা - বক্ররেখা। গল্পটি তিনি শেষ করলেন না, আবার ধারাবাহিকভাবে লিখতেও চাইলেন না। গল্পের শেষে তাঁর ফুটনোটে লেখা ছিলো, এটা কোন ধারাবাহিক নয়। সেলিনা, হাবিব, সিরাজ, মিলন যদি আবার কখনো আসে, তাহলে পরের কাহিনী তাদের কাছ থেকে জেনে আপনাদের জানাবার ইচ্ছা থাকলো! কিন্তু তাঁর এই ফুটনোট অন্য ব্লগাররা মানতে চাইলেন না! এদের মধ্যে আকাশগঙ্গা নামে খ্যাত মিজানুর রহমান পলাশ তো এই লেখাকে বারোয়ারী রূপ দেবার জন্য নাজমুল হুদা ভাইয়ার কাছ হতে রীতিমতো অনুমতি আদায় করে নিলেন। শুরু হলো এমন একটি বারোয়ারী লেখা, যার সাথে জড়িয়ে গেলো এর লেখকদের ব্যক্তিগত আবেগ, আনন্দ, কষ্ট, সবকিছু।

ডাক্তারের রোজনামচা (ডাঃ এস এম নিয়াজ মাওলা) লিখিত তৃতীয় পর্ব শেষে আকাশগঙ্গা একটি মন্তব্য করেন, এইটা  নিয়ে একটা উপন্যাস  লিখে  বইমেলায়  ছাপিয়ে  দিতে পারলে বেশ হয়। এক  বই  কিনে  অনেক লেখকের লেখা পড়া। এভাবেই শুরু হলো এক আকাশছোঁয়া স্বপ্নের, যে স্বপ্নের সারথী আমরা সবাই।

এই বারোয়ারী উপন্যাসের সবচেয়ে মজার দিকটি হচ্ছে, এটি পরিকল্পনা করে শুরু হয়নি, শুরু হয়েছে হঠাৎ করে। কোনো পর্ব লেখার জন্য কাউকে আগে থেকে বলা হয়নি, পর্ব রচয়িতারা নিজেদের আগ্রহে, নিজেদের আনন্দেই, স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসেছেন। প্রত্যেক রচয়িতাই তাদের পর্ব লেখার সময় সম্পূর্ণ স্বাধীন ছিলেন, তাদের কলমকে ইচ্ছেমতো চলতে দেয়া হয়েছে। আরেকটি মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই বারোয়ারী উপন্যাসটি বারো জনেরই লেখা- The Dazzling Twelve.

The Dazzling Twelve:

১. নাজমুল হুদা -  নিজের চাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, “ফিরে দাও সে অরণ্য, লও এ নগর, ফিরে পেতে চাই তারুণ্য--যে চাওয়া কখনও পূরণ হবার নয়।বর্তমানে তিনি খুলনায় থাকেন। ঢাকায় থাকতে হয় বেশিরভাগ সময়। গোঁড়ামি ছাড়া আর সবকিছুই তাঁর পছন্দ। তাঁর একটি প্রিয় উক্তি হচ্ছে, ‘প্রকৃতি প্রার্থনার বশ নয়। প্রকৃতি প্রার্থনার বশ হলে পৃথিবীর চেহারায় বদলে যেত । পৃথিবীর জন্য প্রার্থনাতো কম করা হয় নি।তিনি এই উপন্যাসটির প্রথম পর্ব লেখেন।

২. আকাশগঙ্গা (মিজানুর রহমান পলাশ)- তাঁর নিজের ভাষায়, "আমি মিজানুর রহমান  পলাশ। জন্ম শরীয়তপুর সদরে, এখন পড়ালেখা করছি বুয়েটের ইলেক্ট্রিকাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়রিং এর শেষ বর্ষে। ছোটবেলায় রুলটানা হাতের লেখার খাতায় কবিতা লিখে শুরু হয়েছে আমার লেখালেখির জগত। সবসময় আমার লেখালেখির প্রেরনা ছিলেন আমার মা জাহানারা বেগম এবং বাবা মুন্সী ফজলুল হক। স্বপ্ন দেখি সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত নতুন এক বাংলাদেশের যেখানে শীতের রাতে কাউকে রাস্তার পাশে বসে শীতে কাপতে হবেনা, ক্ষুধার জ্বালায় কাউকে গলায় ফাঁস দিতে হবেনা, কিংবা বখাটের এসিডে ঝলসে যাবেনা আমার বোনদের মুখ।" তিনি এই উপন্যাসটির দ্বিতীয়, অষ্টম এবং দ্বাবিংশ থেকে শেষ পর্ব  পর্যন্ত লেখেন।  
     
৩. ডাক্তারের রোজনামচা (এস এম নিয়াজ মাওলা)- পেশায় ডাক্তার। ঢাকা শাহীন স্কুল এবং ঢাকা কলেজ জীবনে কিছু কিছু লিখতেন, কিন্তু মেডিকেলে এসে ছুরি-কাচি ধরে সাহিত্যের সব কিছুই ভুলে বসে আছেন। ইদানীং রোগী দেখার ফাঁকে ব্লগে লেখা লিখছেন, বন্ধুদের  এবং ডাক্তার সহধর্মিনীর উৎসাহ পাচ্ছেন। প্রফেশনাল জীবনে এই মুহূর্তে সিরাজগঞ্জের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ এবং হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগে কর্মরত আছেন। ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া। তিনি এই উপন্যাসটির তৃতীয়, সপ্তম এবং সপ্তদশ পর্ব লেখেন।      

৪. জুলিয়ান সিদ্দিকী- নিজের সম্পর্কে তাঁর মনোভাব হচ্ছে, “জগতের সব কাজই আমি পারি না। অনেক কাজে অলস হলেও লিখতে কখনও ক্লান্তি বোধ করি না। এতে করে আমার সময়গুলো ভালো কাটে।তিনি এই উপন্যাসটির চতুর্থ ও ষষ্ঠদশ পর্ব লেখেন।      
৫. সাহাদাত উদরাজী- নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, “নিজের সম্পর্কে নিজে কি লিখব! কি বলবো! গুণধর পত্নীই শুধু বলতে পারে তার স্বামী কি জিনিস! তবে পত্নীরা যা বলে আমি মনে করি - স্বামীরা তার উল্টাই হয়! কনফিউশান! ----- আমি নিজেই!!তিনি এই উপন্যাসটির পঞ্চম পর্ব লেখেন।        

৬.  শব্দপুঞ্জ ( ফয়সল কাদের চৌধুরী) -- তিনিও পেশায় ডাক্তার। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে এম এস (ইউরোলজী) কোর্সে অধ্যয়নরত। তিনি এই উপন্যাসটির ষষ্ঠ ও ত্রয়োদশ পর্ব লেখেন।  
       
৭. পাপতাড়ুয়া (সোহেল মাহমুদ)-- ব্যক্তিগত জীবনে যন্ত্রপ্রকৌশলী - কিন্তু তিনি আনন্দ পান মানুষের ভীড়ে সাধারণ হয়ে বেঁচে থাকতে। তিনি বলেন, “ক্রমাগত কিছু পাপ নিয়ে বেড়ে উঠা; তারপর মুক্তির পরম মোহে পাপতাড়ুয়া। চেষ্টা শুধু নিজের একান্ত আয়না সৃষ্টি করার, কেবল একবার নিজেকে খুঁটিয়ে দেখবো বলে। নিশ্চিত কোথাও লুকিয়ে আছে গন্তব্য। নিখুঁত আমি সেই গন্তব্যে যেতে চাই।তিনি এই উপন্যাসটির নবম পর্ব লেখেন। 
        
৮. নাঈফা চৌধুরী অনামিকা -- জন্ম ঢাকাতে। কৈশোর থেকে অস্ট্রেলিয়ার অভিবাসী। হাই স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা অস্ট্রেলিয়াতেই। নাঈফা চৌধুরী অনামিকা অস্ট্রেলিয়ার মন্যাশ ইউনিভার্সিটি থেকে কম্পিউটার সিস্টেমস এবং তড়িৎকৌশলে স্নাতক। জাপানে কেটেছে বেশ কতগুলো বছর। বর্তমানে স্বামী এবং কন্যার সাথে সংযুক্ত আরব আমীরাতে থাকেন। ককেশীয়, মঙ্গোলীয়, সেমেটিক এবং দ্রাবিড় দলভুক্ত মানুষদের অকৃত্রিম বন্ধুত্বলাভের বিরল অভিজ্ঞতায় সৌভাগ্যবতী, অনামিকা স্বপ্ন দেখে যান লোভ, লালসা, প্রতিহিংসামুক্ত এক সুন্দর পৃথিবীর। তিনি এই উপন্যাসটির দ্বাদশ, অষ্টাদশ, বিংশ ও একাবিংশ পর্ব লেখেন।

৯. ময়ূখ রিশাদ (আরিশ)- নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, “নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে গেলে বলতে হয়, আমার গল্প দিয়ে হোক আমার পরিচয়। ডাক্তার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, লেখালেখির স্বপ্নকে আলিঙ্গন করে গোড়ামীবিহীন পৃথিবীর আকাঙ্ক্ষায় আছি।এক্স নটরডেমিয়ান, বর্তমানে পড়ছি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে। শুভ হোক পথচলা, আমার, আপনার, সবার।" তিনি এই উপন্যাসটির দশম পর্ব লেখেন।

১০. আমিন শিমুল - নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, "নিজের সম্পর্কে বলবার তেমন কিছু নেই। পেশাগতভাবে তড়িৎ কৌশলী। লেখালেখি পেশা নেশা কোনটাই না বরং শুধুই নিজের আনন্দের জন্য। আমাদের ভিড়ে আমাকে খুঁজে বেড়াই।নিজের পরিচয় জোছনাস্নাত চন্দ্ররাতে অনিশেষ জোছনায় নিশোষিত অজানা দুঃখ বয়ে বেড়ানো চন্দ্রাহত এক দুঃখবিলাসী হিসাবে।" তিনি এই উপন্যাসটির একাদশ পর্ব লেখেন।

১১. অপাংক্তেয় (নাহিদ আফরোজ)- বরিশালে জন্ম। পেশায় উন্নয়ন পরিকল্পনাবিদ। পড়তে, গান শুনতে ও ঘুরে বেড়াতে ভালবাসেন। ব্যক্তিগত জীবনে দু' সন্তানের জননী। তিনি এই উপন্যাসটির চতুর্দশ পর্ব লেখেন।

১২. জ.ই মানিক  --  নিজের সম্পর্কে তিনি বলেন, “আত্মমগ্ন খ্যাপাটে; নিমগ্ন গর্তজীবি।/কঠোর, কোমল আদলজুড়ে/ছাপ যা ফুটুক বন্য,/বুকে নীরব রক্তক্ষরণ;/দহন, এক অরণ্য।তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন একটা সমাজ ব্যবস্থার, যেখানে বৈষম্য এবং ভেদাভেদ থাকবে না কোনও মানুষে মানুষে। মানুষ পরিচয়টাই মূখ্য হবে মানুষের, জাত-পাত ও অবস্থানের সীমারেখাকে উপড়ে ফেলে। এবং মানুষগুলোও মানুষ হয়ে উঠবে যথার্থ, মানবিক দায়বদ্ধতা, বোধ ও পরিশুদ্ধতায়। তিনি এই উপন্যাসটির পঞ্চদশ ও ঊনবিংশ পর্ব লেখেন।

এই উপন্যাসটির শুরু থেকেই চতুর্মাত্রিক ব্লগের শ্রদ্ধেয় ব্লগারগণ উৎসাহমূলক মন্তব্য দিয়ে সবসময় আমাদের অনুপ্রাণিত করেছেন, আমাদের পাশে থেকেছেন। বিশেষ করে, সুরঞ্জনা, মেঘ অদিতি, একুয়া রেজিয়া, দর্শক, এ এ এম বিপ্লব, নয়ন, আব্দুর রাজ্জাক শিপন, শাওন, নুশেরা তাজরিন, তন্ময়, আব্দুল করিম, ফরিদুল আলম সুমন, বাপী হাসান, মেঘপরী শিলা, জলরঙ, মেঘরঙ, চৈতী আহমেদ, নির্মক্ষিক, স্রোত, বাতিঘর, ইমরান নিলয়, মুর্শেদ রূমী, ঈশান মাহমুদ, মাতরিয়শকা, অদ্ভুত আচার্য, ঝিনুক, মনির, নষ্টালজিক, কবি, শাপলা, তিশা, অর্থহীন, সকাল রয়, তারার হাসি, জুন প্রমুখ - তাঁদের প্রত্যকের কাছে আমরা গভীরভাবে কৃতজ্ঞ, একই সাথে আমরা কৃতজ্ঞ চতুর্মাত্রিকব্লগ এবং এর মডারেটরদের প্রতি। উপন্যাসটির খুব সুন্দর একটি প্রচ্ছদ করে দেবার জন্য মেঘ অদিতিকে আন্তরিক ধন্যবাদ। উপন্যাসে তাঁদের রচিত পংক্তিমালা ব্যবহার করতে দেওয়ায় গীতিকার ও লেখক শেখ রানা, গীতিকার  রাসেল ওনীল এবং হাসান মাহবুব এর প্রতি আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। উপন্যাসটির খুব সুন্দর একটি রিভিউ শত ব্যস্ততার মধ্যেও লিখে দেওয়ার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কারপ্রাপ্ত সুরকার ও গীতিকার কবির বকুল ভাইয়াকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বাংলাদেশের প্রথম বারোয়ারী উপন্যাস প্রকাশে এগিয়ে আসায় অন্যপ্রকাশ এবং মাজহার ভাইকে আমাদের আন্তরিক অভিনন্দন। পরিশেষে এই বারোয়ারী উপন্যাসটিকে সম্পাদনা করে মলাটবন্দী করার জন্য শব্দপুঞ্জ (ফয়সল কাদের চৌধুরী), অপাংক্তেয় (নাহিদ আফরোজ), নাঈফা অনামিকা চৌধুরী, আকাশগঙ্গা (মিজানুর রহমান পলাশ), নাজমুল হুদা এবং ডাক্তারের রোজনামচা (ডাঃ এস এম নিয়াজ মাওলা) এর প্রতি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতা।  

সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।


বইয়ের নামঃ সরলরেখা - বক্ররেখা
ধরনঃ বারোয়ারি উপন্যাস
প্রচ্ছদঃ মেঘ অদিতি
প্রকাশনীঃ অন্যপ্রকাশ (স্টল নং: ২৪৮,২৪৯,২৫০)
আমেরিকা পরিবেশক: মুক্তধারা, জ্যাকসন হাইট, নিউইয়র্ক।
যুক্তরাজ্য পরিবেশক:সঙ্গীতা লিমিটেড, ২২ ব্রিক লেন, লন্ডন, যুক্তরাজ্য।
পৃষ্ঠাঃ ১১২
মূল্যঃ ২০০ টাকা মাত্র


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন